একই ছাদের তলায় ১৬টি দুর্গা প্রতিমা! ভূ-ভারতে বিরল এই কাণ্ড দেখতে উপচে পড়ছে ভিড়!

দুর্গোৎসবে সাধারণত কোনো একটি পরিবারে বা বংশে একটাই দুর্গাপুজো হতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়লে বা ভাইয়েরা পৃথক হলেও যৌথভাবে একটি মণ্ডপেই কুলদেবীর আরাধনা সম্পন্ন হয়। কিন্তু মালদা জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা এক গ্রামে মিলল একেবারেই ভিন্ন ছবি। সেখানে একই বংশের ১৬টি পৃথক বাড়িতে আয়োজন করা হয় ১৬টি ভিন্ন দুর্গাপুজো!
মালদার কালিয়াচক ৩ নম্বর ব্লকের রামনগর গ্রামের মণ্ডল পরিবারের এই অদ্ভূত ও বিরল প্রথা ঘিরে ইতিমধ্যেই গোটা উত্তরবঙ্গে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।
একই উঠোনে ১৬টি প্যান্ডেল ও প্রতিমা গড়া
বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁই সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই রামনগর গ্রাম। গ্রামের মণ্ডল পরিবারে পা রাখলেই চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য। দুর্গাপুজো ঘনিয়ে আসতেই এখানকার প্রতিটি সারিবদ্ধ বাড়ির সামনে বাঁধতে দেখা যায় বাঁশের প্যান্ডেল। প্রতিটি ঘরে আলাদা করে এক-মেটে ও দো-মেটে করা হয় দুর্গা প্রতিমা।
পরিবারের সদস্য সুশীলকুমার মণ্ডল জানান, প্রায় ২০০ বছর আগে প্রপিতামহ মংলু মণ্ডলের পাওয়া স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। কালক্রমে পরিবার বড় হয়েছে, ভাইদের মধ্যে হাঁড়ি আলাদা হয়েছে, কিন্তু মায়ের পুজো বন্ধ করেননি কেউ। যেহেতু মা দুর্গা তাঁদের কুলদেবী, তাই আলাদা হওয়া প্রতিটি পরিবার নিজের নিজের সামর্থ্য ও ভক্তি নিয়ে নিজ গৃহেই মায়ের আলাদা প্রতিমা গড়ে আরাধনা শুরু করেন।
বর্তমানে এই পরিবারে ২০টি ঘর রয়েছে, যার মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে ১৫ থেকে ১৬টি ঘরে স্বতন্ত্রভাবে প্যান্ডেল বেঁধে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। তবে এ বছর পরিবারের এক নিকটাত্মীয়ের আকস্মিক বিয়োগের কারণে ৮টি ঘরে পুজো বন্ধ রয়েছে। বাকি ৮টি পরিবারে পুরোদমে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি।
“পরিবার ভাগ হলেও আমরা মায়ের আরাধনায় কোনো ভাগ করিনি। মা আমাদের কুলদেবী, তাই প্রতিটা ঘর নিজের উপার্জনেই পৃথক পুজো করে। ভূ-ভারতে এমন পুজোর নিদর্শন আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না।” — সুশীলকুমার মণ্ডল, পরিবারের সদস্য।
বলিপ্রথা ও স্বনির্ভর আরাধনা
এই পরিবারের আর এক গৃহবধূ শিবানী মণ্ডল জানান, প্রতিটি পুজোর খরচের জন্য বাইরের কোনো চাঁদা তোলা হয় না। পুরো খরচটাই পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই বহন করেন। বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে প্রতিটি পুজোতেই গড়ে এক থেকে সোয়া লাখ টাকা খরচ হয়। ভবিষ্যতে পরিবার আরও বিভাজিত হলে এই পুজোর সংখ্যা ১৬ থেকে বেড়ে আরও বেশি হতে পারে!
মণ্ডল পরিবারের আরাধনায় আজও বজায় রয়েছে প্রাচীন ছাগবলি প্রথা। তবে আধুনিক সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অনেক পরিবার অহিংসার পথ বেছে নিয়ে বলিপ্রথা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
উৎসবের ক’টা দিন গ্রামে বহিরাগত দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে পুলিশ প্রশাসনও বিশেষ ট্রাফিক পথ তৈরি করে সহায়তা করে। এক পরিবারে এতগুলি পুজোর ঐতিহ্য সত্যিই সমগ্র বাংলার পুজো সংস্কৃতিতে এক অনবদ্য ও চমকপ্রদ অধ্যায়।