সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দেখে মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা ঢালছেন? অজান্তেই কোন ভয়ানক ফাঁদে পা দিচ্ছেন নতুন বিনিয়োগকারীরা?

সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে এই বাজারে পা রাখার পর নতুন বিনিয়োগকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়ায়— ঠিক কোথা থেকে শুরু করা উচিত? বর্তমানে বাজারে শত শত লার্জ-ক্যাপ, ফ্লেক্সি-ক্যাপ, মিড-ক্যাপ, স্মল-ক্যাপ, হাইব্রিড এবং ডেট স্কিম উপলব্ধ রয়েছে। যেহেতু প্রতিটি স্কিমের ঝুঁকি, রিটার্ন এবং বিনিয়োগের সময়সীমা আলাদা, তাই বেশিরভাগ নতুন বিনিয়োগকারী একটি সহজ শর্টকাট পথ বেছে নেন। তাঁরা কেবল সেই ফান্ডটিই অন্ধের মতো বেছে নেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভুলের কারণে বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।
সঠিক স্কিমটি কীভাবে বেছে নেবেন?
‘FundsIndia.com’-এর সিইও ঋষভ গার্গ জানাচ্ছেন, একটি মিউচুয়াল ফান্ড বেছে নেওয়ার সময় শুধুমাত্র অতীতের পারফরম্যান্স বা বিগত বছরের লাভ দেখাই যথেষ্ট নয়। কোনো নির্দিষ্ট ফান্ড আপনার জন্য আদৌ সঠিক কিনা, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার আর্থিক লক্ষ্য এবং বাজারের মন্দার সময় বড় ধাক্কা বা লোকসান সহ্য করার মানসিক ক্ষমতার উপর। তাঁর মতে, নতুন বিনিয়োগকারীদের যেকোনো ফান্ডে হাত দেওয়ার আগে মূলত তিনটি মৌলিক বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত।
প্রথম বিবেচ্য বিষয়— লক্ষ্য ও সময়সীমা: আপনার নির্দিষ্ট আর্থিক লক্ষ্য কী এবং তা অর্জনের জন্য কত সময় হাতে রয়েছে, তা সবার আগে দেখা দরকার। যেমন, আগামী দুই বছর পরের কোনো ভ্রমণের জন্য জমানো টাকা কখনোই এমন কোনো তহবিলে বিনিয়োগ করা উচিত নয়, যা ২০ বছর পরে অবসর গ্রহণের জন্য সরিয়ে রাখা হয়েছে। দুটির বিনিয়োগ কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা।
দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয়— ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা: বিনিয়োগকারীদের শুধু মুখে মুখে ঝুঁকি বিচার করলে চলে না। খারাপ সময়ে পোর্টফোলিওর মূল্য হঠাৎ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে গেলে তারা মানসিকভাবে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা সততার সঙ্গে বিচার করা উচিত। বাজারের প্রথম বড় পতনেই যদি কোনো বিনিয়োগকারী আতঙ্কিত হয়ে স্কিম থেকে টাকা তুলে নেন, তবে অতীতের রিটার্ন যাই হোক না কেন, সেই ফান্ডটি তাঁর জন্য উপযুক্ত নয়।
তৃতীয় বিবেচ্য বিষয়— ফান্ডের প্রকৃতি: তহবিলটির শ্রেণী, বিভিন্ন বাজার চক্রে এর কার্যকারিতার দীর্ঘ ইতিহাস এবং এর পরিচালন খরচ কত, তা খতিয়ে দেখা। তবে নিজের লক্ষ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চিত করার পরেই কেবল এই বিষয়গুলি বিবেচনা করা উচিত।
শুধুমাত্র অতীতের রিটার্ন দেখে স্কিম বাছা ভুল:
নতুন বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই তালিকার একদম শীর্ষে থাকা ফান্ডের দিকে অন্ধের মতো ছুটে যান। ঋষভ গার্গ সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের রিটার্ন অবশ্যই সহায়ক, তবে এটি সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। এক বছরের রিটার্নে শীর্ষে থাকা কোনো ফান্ড হয়তো এমন সাফল্যের মুখ দেখেছে কারণ সেই নির্দিষ্ট সময়ে বাজারের একটি নির্দিষ্ট অংশ দারুণ তেজি ছিল। বাজারের পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গেই এই ফান্ডগুলির পারফরম্যান্সও বদলে যায়।
তাই শুধু এক বছরের পারফরম্যান্স না দেখে বিনিয়োগকারীদের ৩-বছর, ৫-বছর এবং সম্ভব হলে ১০-বছরের দীর্ঘমেয়াদী পারফরম্যান্স ট্র্যাক করা উচিত। বাজারের মন্দার সময় ফান্ডটি কীভাবে নিজেকে ধরে রেখেছিল এবং সমকক্ষ অন্যান্য ফান্ডের তুলনায় এটি কেমন পারফর্ম করেছে, সেটাও দেখা জরুরি। গার্গ মনে করিয়ে দিয়েছেন, যে ফান্ড মাঝে মাঝে আকাশছোঁয়া কিন্তু বাকি সময় নিম্নমুখী রিটার্ন দেয়, তার চেয়ে যে স্কিম ধারাবাহিকভাবে স্থিতিশীল রিটার্ন দেয়, সেটিই সবসময় শ্রেয়।
লক্ষ্য অনুযায়ী সঠিক বিভাগ বা ক্যাটাগরি বাছুন:
বিনিয়োগকারীদের উচিত তাঁদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে বিপরীত ক্রমে পরিকল্পনা করা।
১ বা ২ বছরের মধ্যে টাকার প্রয়োজন হলে— ডেট ফান্ড সবচেয়ে ভালো।
আগামী কয়েক বছরের লক্ষ্যের জন্য— হাইব্রিড ফান্ড সঠিক পছন্দ।
৫ বছর বা তার বেশি দূরের লক্ষ্যের জন্য— ইক্যুইটি ফান্ড সবচেয়ে উপযুক্ত।
ইকুইটির ক্ষেত্রে লার্জ-ক্যাপ এবং ফ্লেক্সি-ক্যাপ ফান্ড নতুন বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর মূল ভিত্তি হতে পারে। মিড-ক্যাপ এবং স্মল-ক্যাপ ফান্ডগুলোর দ্রুত বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও এগুলো অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়, তাই নতুনদের প্রাথমিকভাবে এই ফান্ডগুলোতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা থেকে দূরে থাকা উচিত।
সময় অনুযায়ী সঠিক পরিকল্পনা:
৩-বছরের লক্ষ্য: বাড়ি কেনার ডাউন পেমেন্টের মতো স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যে মূলধন সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিন। এর জন্য ডেট বা স্বল্প-মেয়াদী ফান্ডের ওপর জোর দিন এবং একটি ছোট অংশ হাইব্রিড ফান্ডে রাখুন।
৫-বছরের লক্ষ্য: সন্তানের পড়াশোনার মতো লক্ষ্যের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা উভয়েরই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে হাইব্রিড বা ফ্লেক্সি-ক্যাপ পোর্টফোলিওর সঙ্গে ডেট ফান্ড রাখতে পারেন। লক্ষ্য যত কাছে আসবে, টাকা ধীরে ধীরে ডেট ফান্ডে সরিয়ে নিন।
১০-বছরের লক্ষ্য: অবসরের মতো দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের ক্ষেত্রে তহবিলের একটি বড় অংশ শেয়ারে রাখা যেতে পারে, কারণ দীর্ঘ সময় বাজারকে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়।
মিউচুয়াল ফান্ড বেছে নেওয়ার সহজ সূত্র:
শত শত স্কিমের ভিড়ে বিভ্রান্তি এড়াতে আপনি খুব সহজেই ‘লক্ষ্য, বিভাগ, যাচাই’— এই তিন ধাপের সূত্রটি মেনে চলতে পারেন।
১. লক্ষ্য: আপনার ঠিক কত টাকা প্রয়োজন এবং তা কখন প্রয়োজন, তা স্থির করুন।
২. বিভাগ: আপনার সময়সীমা এবং ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সঠিক ক্যাটাগরি বাছুন। এর ফলে শত শত বিকল্পের বিশাল তালিকাটি মাত্র কয়েকটি তহবিলে নেমে আসবে।
৩. যাচাই (Check): সেই ক্যাটাগরির ৩ থেকে ৪টি ফান্ডকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী পারফরম্যান্স, খরচ এবং ফান্ড হাউসের শক্তির ভিত্তিতে তুলনা করুন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নতুন বিনিয়োগকারীর পক্ষে একবারে পাঁচটি আলাদা স্কিম না কিনে একটি সুবিন্যস্ত ও বৈচিত্র্যময় স্কিম দিয়ে বিনিয়োগের যাত্রা শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।