“মৃত তারার ছাই থেকে জন্ম!”-মহাকাশে রহস্যময় গ্রহের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা

মহাজাগতিক বিস্ময়ের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সম্পূর্ণ নতুন এক উপায়ে গঠিত এবং আগে কখনো দেখা যায়নি এমন এক রহস্যময় গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই গ্রহটি কোনো সাধারণ নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে না, বরং এটি তৈরি হয়েছে একটি মৃত তারার ধ্বংসাবশেষ বা ছাই থেকে! বিজ্ঞানীদের দাবি, মহাবিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মৃত তারার চারপাশে এমন ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের’ গ্রহের সন্ধান মিলল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিনব গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়ারউইক’-এর পিএইচডি শিক্ষার্থী জেমি উইলিয়ামস।

কীভাবে জন্ম এই রহস্যময় গ্রহের?

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রজন্মের বিভিন্ন গ্রহ এমন এক জগৎ, যা কোনো তারা নিজের মৃত্যুর সময় আশপাশে যেসব উপাদান ছুড়ে ফেলে, তা থেকেই গঠিত হয়। এ ধরনের গ্রহ বিস্ময়করভাবে বিরল। কোনো শ্বেত বামন (White Dwarf) তারার আশপাশে এমন গ্রহের উপস্থিতি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। বিষয়টি ঠিক এমন এক গ্রহ খুঁজে পাওয়ার মতো, যা যে তারাটিকে একসময় প্রদক্ষিণ করত, ঠিক সেই তারারই ছাই থেকে পুনর্জন্ম লাভ করেছে।

এর আগে বিজ্ঞানীরা ‘পালসার’ বা নিউট্রন তারার চারপাশে এ ধরনের সম্ভাব্য পুনর্গঠিত জগতের সন্ধান পেলেও, কোনো শ্বেত বামনের চারপাশে এমন ঘটনার নজির এই প্রথম। মহাবিশ্বে শ্বেত বামন বেশ সাধারণ ঘটনা হওয়ায় বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ ধরনের গ্রহ পূর্ব ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সংখ্যায় থাকতে পারে।

রাসায়নিক সংকেতে মিলল রহস্যের জট

নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ‘এইচএস ০২০৯+০৮৩২’ নামের একটি শ্বেত বামনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ সময় তারা তারার চারপাশে অত্যন্ত অস্বাভাবিক রাসায়নিক উপাদান দেখতে পান, যার মধ্যে ‘নিওবিয়াম’ উপাদানের আধিক্য ছিল। সাধারণত তারার মৃত্যুর সময়ই এই উপাদান তৈরি হয়, অথচ এর আগে কোনো শ্বেত বামনে এর দেখা মেলেনি।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, শ্বেত বামনটি তার কাছাকাছি থাকা নবগঠিত একটি বড় গ্রহ থেকে উপাদান টেনে নিচ্ছে। আর সেই বড় গ্রহটি নিজেই তারার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া অংশবিশেষ ও শ্বেত বামনে রূপান্তরিত হওয়ার সময়কার উপাদানের অবশিষ্টাংশ থেকে গঠিত হয়েছিল। নাসার ‘টেস’ (TESS) টেলিস্কোপের ডেটা ব্যবহারের পর এই আবিষ্কার আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। টেলিস্কোপের তথ্যে গ্রহটি থেকে আসা একটি ক্ষীণ সংকেত ধরা পড়েছে, যা প্রতি চার দশমিক চার দিনে পুনরাবৃত্তি হয়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, শ্বেত বামনের অতি কাছাকাছি থাকার কারণে তীব্র বিকিরণের ফলে এই বৃহস্পতি-আকারের গ্রহটির বাইরের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদান বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে। সেই ছিটকে যাওয়া উপাদান যখন শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে, তখনই এমন অস্বাভাবিক রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়।

বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত ও ভিনগ্রহের প্রাণীর খোঁজ

এই আবিষ্কার নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলে, মৃত তারার আলোতে একই ধরনের রাসায়নিক উপাদান খুঁজে বের করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বহু নতুন গ্রহ আবিষ্কারের পথ খুলে যাবে। পাশাপাশি, এটি বাসযোগ্য গ্রহ এবং সেখানে ভিনগ্রহের প্রাণীর (Alien Life) সন্ধানে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

এ ধরনের গ্রহগুলোর গঠন প্রক্রিয়া স্পষ্ট হলে তা শ্বেত বামনের চারপাশের গ্রহগুলো আদতে বাসযোগ্য কি না, তা বুঝতেও দারুণভাবে সাহায্য করবে। গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ স্থান পেয়েছে খ্যাতনামা বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *