স্বপ্নাদেশ পেয়ে কলকাতা ছেড়ে বর্ধমান আসেন সুরা ব্যবসায়ী! নবাবের থেকে জমি কিনে কীভাবে শুরু হয়েছিল এই ঐতিহাসিক পুজো?

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো মানেই বনেদি বাড়িগুলির অন্দরে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ইতিহাস, পৌরাণিক রীতি আর অজস্র অজানা অলৌকিক কাহিনি। কলকাতার জমিদার বাড়ির পুজোর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার এমন কিছু পুজো রয়েছে, যার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস। তেমনই এক অনন্য ও ঐতিহ্যমণ্ডিত পুজো হলো বর্ধমান শহরের বেড়মোড় এলাকার প্রামাণিক বাড়ির দুর্গাপুজো। যে পুজোর নেপথ্যে রয়েছে দেবীর সরাসরি স্বপ্নাদেশ এবং শত শত বছরের এক অদ্ভুত অলৌকিক বিশ্বাস।
স্বপ্নাদেশ ও নবাবের সঙ্গে সংযোগ: ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২৬৩ বছর আগে প্রামাণিক পরিবারের পূর্বপুরুষ বিহারীলাল প্রামানিক ছিলেন কলকাতার একজন প্রখ্যাত সুরা ব্যবসায়ী। সেসময় বর্ধমানের বেড়মোড় এলাকাটি ছিল সম্পূর্ণ জঙ্গলঘেরা। জনশ্রুতি রয়েছে, স্বপ্নাদেশে স্বয়ং দেবী দুর্গা বিহারীলালবাবুকে জানান যে তিনি ওই ঘন জঙ্গলের মধ্যেই অবস্থান করছেন। দেবীর নির্দেশ পেয়ে বর্ধমানে ছুটে আসেন বিহারীলাল। সেখানে এসে তিনি দেখতে পান, এক বৃদ্ধা মহিলা জঙ্গলের মধ্যে দেবীর অর্চনা করছেন।
তিনি সেখানে দেবী প্রতিমা প্রতিষ্ঠার মনস্থির করলেও সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আইনি জটিলতা, কারণ জমিটি ছিল তৎকালীন নবাবের অধীনস্থ। দমে না গিয়ে বিহারীলাল সরাসরি নবাবের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর পাওয়া স্বপ্নাদেশের সমস্ত কথা খুলে বলেন। ভক্তের আকুতি ও বিশ্বাসের কথা শুনে নবাব তাঁকে সেই জমি বিক্রি করতে রাজি হয়ে যান। এরপর যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেখানে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক প্রামানিক বাড়ি ও দুর্গা দালান।
২৬৩ বছরের অলৌকিক রীতি ও বিশ্বাস: প্রামানিক পরিবারের বর্তমান সদস্য চৈত্র প্রামানিক জানান, তাঁদের এই পুজোয় শতাব্দী প্রাচীনকাল থেকেই কোনো বলি প্রথার প্রচলন নেই। তার পরিবর্তে পুজোয় রয়েছে কিছু ব্যতিক্রমী ও রহস্যময় আচার। সন্ধিক্ষণের ঠিক আগে দেবীর সামনে সুসজ্জিত গদি দিয়ে একটি বিছানা পেতে দেওয়া হয়। প্রামানিক পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস, সন্ধিপুজোর সময় স্বয়ং দেবী দুর্গা এসে সেই সুসজ্জিত বিছানার ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে বেদীতে অধিষ্ঠান করেন! আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অলৌকিক বিশ্বাসে সামান্যতম ফাটলও ধরেনি।
পাশাপাশি, এখানে দেবীর চার সন্তানের সঙ্গে বিশেষভাবে পূজিত হন তাঁর দুই সখী— জয়া ও বিজয়াও। এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা বিহারীলাল প্রামাণিকের আমলের সেই প্রাচীন কাঠের কাঠামোটি আজও অক্ষত রয়েছে। প্রতিবছর বিসর্জনের পরের দিন সকালে সেই পুরনো কাঠামোটাই দুর্গা দালানে তুলে আনা হয় এবং পরবর্তী বছরে সেই কাঠামোর ওপর মাধ্যমেই আবার নতুন প্রতিমা গড়া হয়। জাঁকজমক কিছুটা কমলেও, প্রাচীন এই অলৌকিক রীতি আর ঐতিহ্যের টানে আজও বহু মানুষ ভিড় জমান বর্ধমানের এই প্রামানিক বাড়িতে।