ষোড়শ শতকের ইতিহাস আর ৬৫০ বছরের পুরনো অষ্টধাতুর মূর্তি! জলপাইগুড়ির এই দুর্গোৎসবের গোপনীয়তা জানলে চোখ কপালে উঠবে

রাজ্যের প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম হলেও প্রচারের আলোর অনেকটাই দূরে রয়েছে জলপাইগুড়ি পান্ডাপাড়া কালীবাড়ি এলাকার চক্রবর্তী বাড়ির দুর্গাপুজো। প্রায় সাড়ে ছয়শো বছরের পুরনো ৯ ইঞ্চির এক বহুমূল্য অষ্টধাতুর মূর্তিকে কেন্দ্র করেই বংশপরম্পরায় এই পুজো হয়ে আসছে। পরিবারের দাবি, হুসেন শাহের আমল থেকেই এই বিশেষ মূর্তির পুজো হয়ে আসছে। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, রাজাসাহি জেলার তাহেরপুরের তৎকালীন রাজা কংসনারায়ণ রায় ষোড়শ শতাব্দীতে প্রায় ৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই সর্বজনীন পুজোর প্রচলন করেছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে বাংলার মাটিতে পুজো স্থানান্তরের ইতিহাস

চক্রবর্তী পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ওপার বাংলার টাঙ্গাইলে এই পুজো করতেন। পরবর্তীতে হুসেন শাহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাজা শ্রীহট্ট সেনের বাড়িতে দেবী দুর্গার বিগ্রহ নিয়ে আশ্রয় নেন মুকুন্দ রাম রায়। শুধু বিগ্রহটি বাঁচানোর জন্যই তিনি নিজের উপাধি পরিবর্তন করে ‘রাজ চক্রবর্তী’ রাখেন এবং যুদ্ধ জয় করেন। পরবর্তীতে জুরান চক্রবর্তী, শিবরাম চক্রবর্তী ও মধুসূদন চক্রবর্তীর হাত ধরে এই ঐতিহাসিক অষ্টধাতুর মূর্তি জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়ায় এসে পৌঁছয়। এখানে বছরের ৩৬৫ দিনই দেবীর নিত্যপুজো হয়, তবে দুর্গাপুজোর কদিন মেতে ওঠে গোটা পরিবার।

ভোগের অনন্য নিয়ম ও বলপ্রথার বদল

অতীতে বাংলাদেশের বাড়িতে এই পুজোয় প্রচুর পশুবলি হলেও দীর্ঘদিন আগেই সেই প্রথা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে চক্রবর্তী পরিবার। বর্তমানে সম্পূর্ণ পুথি মেনে পুজো হয়। এই পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বিশেষ ভোগ। পরিবারের সদস্য অর্ঘ্য চক্রবর্তী জানান, সপ্তমীতে খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হলেও অষ্টমীতে বোয়াল মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক এবং নবমীতে বিশেষভাবে বোয়াল মাছ দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। এছাড়া দশমীর দিন পান্তাভাত ও শালুক শাক দিয়ে ভোগ দেওয়ার প্রাচীন রীতি আজও পরম যত্নে পালন করা হচ্ছে। পুজোর জন্য বাইরে থেকে কোনো পুরোহিত ডাকা হয় না, পরিবারের সদস্যরাই এই পুজোর সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূর্তিটির বয়স সাড়ে ছয়শো বছর বা তারও বেশি হতে পারে, যার ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করতে আবারও কার্বন পরীক্ষার কথা ভাবছেন বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *