পলিসিবাজারের শেয়ারে রক্তগঙ্গা! ৪ দিনে ৪৩% ধস নামতেই কপালে হাত বিনিয়োগকারীদের

শেয়ার বাজারে মাঝে মাঝে এমন সব খবর সামনে আসে, যা রাতারাতি একটি শক্তিশালী স্টকের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। আজকাল পলিসিবাজারের মূল সংস্থা পিবি ফিনটেকের (PB Fintech) বিনিয়োগকারীদের ঠিক এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হচ্ছে। বাজারে এই সংস্থার শেয়ারের ওপর তীব্র বিক্রির চাপ বজায় রয়েছে। গত কয়েক দিনে এই স্টকে যে ধস নেমেছে, তাতে বিনিয়োগকারীদের বড় অংকের মূলধন উবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

আজকের ট্রেডিং সেশনে সংস্থাটির স্টকের দাম আরও ৬ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। আপনি যদি শুধু গত চার দিনের ট্রেডিংয়ের তথ্য খতিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন এই স্টকটির দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মোট পতনের ৩৬ শতাংশই ঘটেছে মাত্র একদিনের একক ট্রেডিংয়ে। স্টকটিকে স্থিতিশীল করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর এইচডিএফসি মিউচুয়াল ফান্ড ১,২৮২.৩০ টাকা দরে পিবি ফিনটেকের ২৫ লক্ষ শেয়ার কিনে একটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছিল। এমনকি বিদেশি ব্রোকারেজ ফার্ম বার্নস্টাইনও এই কোম্পানিটি সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছিল। তা সত্ত্বেও এই পতন আটকানো যায়নি। আজ বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (BSE) স্টকটির দর ৪.৭৭ শতাংশ কমে ১,০৯৬.৯০ টাকায় নেমে এসেছে। এমনকি ইন্ট্রাডে ট্রেডিং চলাকালীন এটি একসময় ৬.৫৬ শতাংশ পর্যন্ত পতন দেখে সর্বনিম্ন ১,০৭৬.৩৫ টাকায় ঠেকেছিল।

আইআরডিএ-র নতুন প্রস্তাবই কি সব ওলটপালট করে দিল?
প্রশ্ন উঠছে, এত শক্তিশালী একটি স্টক হঠাৎ কেন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল? এর মূল উত্তর লুকিয়ে রয়েছে দেশের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই (IRDAI)-এর একটি নতুন প্রস্তাবের মধ্যে। বীমা পলিসি বিক্রির বিদ্যমান নিয়মাবলীতে কিছু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নতুন এই কাঠামো কার্যকর হলে স্বাস্থ্য, মোটর এবং জীবন বীমার ওপর দেওয়া কমিশনের সর্বোচ্চ সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইআরডিএ-র এই প্রস্তাবটি সরাসরি পিবি ফিনটেকের মূল ব্যবসায়িক মডেলের জন্য একটি বিরাট বড় ধাক্কা।

কমিশনের ওপর এই সীমা আরোপের খবর পলিসিবাজারের আয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কোম্পানির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জারি করেছে। তাদের অনুমান, এই প্রস্তাবগুলি বাস্তবায়িত হলে কোম্পানির মূল রাজস্ব ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। যার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ বীমা ব্যবসার ওপর। এই আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে কোম্পানিটি এখন বিকল্প কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করেছে। খরচ কমাতে নতুন কর্মী নিয়োগ সীমিত করার পাশাপাশি বিপণন বা বিজ্ঞাপন বাজেট ছাঁটাই করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও বিবেচনাধীন রয়েছে।

ব্রোকারেজ হাউসগুলির সতর্কতা ও লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস
আইআরডিএ-র এই নীতির ধাক্কায় বড় বড় ব্রোকারেজ ফার্মগুলি পিবি ফিনটেক নিয়ে তাদের পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে। এইচএসবিসি (HSBC) গত সপ্তাহে এই স্টকের রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। তারা এটিকে ‘হোল্ড’ বা ধরে রাখার পরামর্শ দিয়ে টার্গেট প্রাইস বা লক্ষ্যমাত্রা ২,১০০ টাকা থেকে কমিয়ে সরাসরি ১,১৫০ টাকায় নামিয়ে এনেছে। দেশীয় ব্রোকারেজ ফার্ম মতিলাল ওসওয়ালও ১,১৫০ টাকার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়ে তাদের ‘নিউট্রাল’ রেটিং বজায় রেখেছে।

তবে বিদেশি ব্রোকারেজ সংস্থা বার্নস্টাইনের সুর কিছুটা আলাদা। তারা এই স্টকটিকে ‘আউটপারফর্ম’ রেটিং দিয়ে ২,৩১০ টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যদিও বার্নস্টাইনও একটি বড় সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের অনুমান, আইআরডিএআই-এর নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে পিবি ফিনটেকের বীমা গ্রহণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এর জেরে সুদূরপ্রসারী ধাক্কায় ২০২৮ অর্থবর্ষের মধ্যে কোম্পানির নিট মুনাফা ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, আগামী দিনে এই শেয়ারের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *