ইউনেস্কোর লোগো বেচে ৬০ কোটির দুর্নীতি! প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বাগানবাড়িতে ইডি হানায় তুলকালাম

ইউনেস্কোর নাম এবং লোগো ভাঙিয়ে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের নামে কোটি কোটি টাকা তোলার অভিযোগে এবার কোণঠাসা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা ও গায়ক ইন্দ্রনীল সেন। মঙ্গলবার সাতসকালে কসবা, হাইল্যান্ড পার্ক, হিন্দুস্থান পার্ক থেকে শুরু করে হুগলির সিঙ্গুরের বাগডাঙা চীনামোড় গ্রামের ছুটিপুর এলাকায় ইন্দ্রনীলের ‘মোহর’ নামক বিলাসবহুল বাগানবাড়িতে হানা দিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই মেগা অভিযানে রাজ্য রাজনীতিতে চরম শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

‘মোহর’ বাগানবাড়িতে তালাবন্ধ তল্লাশি ও বিক্ষোভ
এদিন সকালে সিঙ্গুরের ছুটিপুরে ইন্দ্রনীলের কয়েক বিঘা জমির উপর তৈরি ‘মোহর’ বাগানবাড়ির মূল গেট বন্ধ করে ভিতরে ম্যারাথন তল্লাশি শুরু করেন ইডি আধিকারিকরা। আর এই খবর চাউর হতেই বাগানবাড়ির বাইরে প্রবল বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের অভিযোগ, পঞ্চায়েতের কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিশাল বাগানবাড়ি তৈরি করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। বাড়ির চারপাশ উঁচু করে ঘেরাও করা হলেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের জন্য কোনো নিকাশি নালা রাখা হয়নি। এর ফলে এলাকার প্রায় ১০-১২ কাঠা জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘মাস আর্ট’ ও ৬০ কোটির দুর্নীতি
ইডির এই ঝটিকা অভিযানের মূল শিকড় লুকিয়ে রয়েছে ‘মহানির্বাণ রোড মাস আর্ট সোসাইটি’ বা ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে। ২০২২ সালে তৈরি হওয়া এই সংগঠনের কার্যকলাপে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনের নাম জড়িয়েছে। দুর্গাপুজোর ঠিক আগে কলকাতার ২৪টি বাছাই করা পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখার জন্য বিশেষ প্রিভিউ শোয়ের আয়োজন করত এই সংস্থা।

অভিযোগ উঠেছে, এই প্রিভিউ শো-কে সামনে রেখেই ইউনেস্কোর নাম ও লোগো বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। নিজেদের ইউনেস্কোর অফিশিয়াল পার্টনার হিসেবে জাহির করে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার চালানো হয় এবং চড়া দামে বিক্রি করা হয় টিকিট। সাধারণ দর্শকদের জন্য নয়, নির্দিষ্ট কয়েক হাজার টাকার পাস বা টিকিটের মাধ্যমেই ওই পুজোগুলি ঘোরার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তদন্তে প্রাথমিকভবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে এসেছে। স্পনসরশিপ ও বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঠিক কোথায় পাচার হয়েছে, এখন তারই হদিস খুঁজছেন গোয়েন্দারা।

রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে
ঘটনা প্রসঙ্গে বিজেপির সিঙ্গুর মণ্ডল ২-এর সভাপতি উজ্জল খামারু কটাক্ষ করে বলেন, “এটা তো হওয়ারই ছিল। এই মোহরকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর ধরে জমি অধিগ্রহণ থেকে বিল্ডিং নির্মাণ—সর্বত্র দুর্নীতি হয়েছে। এর পেছনে ইন্দ্রনীল সেন ও বেচারাম মান্নার হাত রয়েছে।” অন্যদিকে, চন্দননগরের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। এই দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডরা কেউ রেহাই পাবে না।”

এর আগে কলকাতা পুলিশের কাছে এই বিষয়ে এফআইআর দায়ের হয়েছিল। তবে এবার আর্থিক কেলেঙ্কারির পরিধি বিশাল হওয়ায় তদন্তভার হাতে নিয়ে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে ইডি। আজকের এই ম্যারাথন রেইডে কোন কোন গোপন নথি ও চাঞ্চল্যকর তথ্য কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের হাতে উঠে আসে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *