পাহাড়ে বারবার প্লাবন আর ভয়ঙ্কর ধসের দিন শেষ? সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় নবান্নের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত!

উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে সমতল— অনবরত ধস, নদীগুলোর রুদ্ররূপ এবং হড়পা বানের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত জনজীবন। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ও মিরিকের মতো শতাব্দীর প্রাচীন পাহাড়ি শহরগুলোকে এবার বড়সড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মাঠে নামল রাজ্য সরকার। নবান্নের তরফে রাজ্যের নগর উন্নয়ন ও পুরবিষয়ক দফতর একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে।

গত ৩১ অগস্ট দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা প্রশাসনকে চিঠি লিখে হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ভৌগোলিক ঝুঁকি ও পরিকাঠামোগত সঙ্কটের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিলেন। সেই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

কমিটির নেতৃত্বে বিশ্ববরেণ্য বিশেষজ্ঞ: রাজ্যের নগর উন্নয়ন ও পুরবিষয়ক দফতর জানিয়েছে, পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত পর্বত বিজ্ঞানী ড. একলব্য শর্মা এই উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের জেলাশাসকদের যৌথ সদস্য-আহ্বায়ক করা হয়েছে।

কমিটিতে সদস্য হিসেবে যোগ দিচ্ছেন:

  • রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতর ও সেচ দফতরের প্রতিনিধিরা

  • জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (GSI)

  • নগর উন্নয়ন দফতর ও শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (SJDA)

  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি খড়গপুর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও আইআইইএসটি শিবপুরের খ্যাতনামা গবেষক ও বিজ্ঞানীগণ।

কেন এই জরুরি পদক্ষেপ? গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে উত্তর সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের জেরে তিস্তা নদীর জলোচ্ছ্বাসে যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চলেছিল, তার ক্ষত এখনও শুকায়নি। সম্প্রতি নেপালেও একই ধরনের হ্রদ বিস্ফোরণে অববাহিকা অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গোটা হিমালয় অঞ্চল ভূ-গঠনগতভাবে চরম অস্থির হয়ে উঠছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, হিমবাহের দ্রুত গলন এবং পাহাড় ধসে বারবার স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি পথ ও পর্যটন শিল্প, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

কাজের প্রধান তিনটি লক্ষ্য: ১. আগাম সতর্কতা প্রোটোকল: পাহাড়ি নদীগুলোর অস্বাভাবিক জলস্ফীতি ও আচরণ ট্র্যাক করে আগেই প্রশাসনিক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা। ২. নিকাশি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার: ব্রিটিশ আমলে তৈরি এক শতাব্দী প্রাচীন জরাজীর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা বদলে আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করা। ৩. পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ: জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ সামলাতে পাহাড়ে নিরাপদ ও স্থিতিশীল এলাকা চিহ্নিত করে নতুন নগর কাঠামোর পরিকল্পনা তৈরি করা।

এই আধুনিক মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ের পাশাপাশি তরাই ও ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ বন্যার হাত থেকে স্থায়ী রক্ষা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *