‘বাংলা নিয়েছো, এবার দিল্লি ছিনিয়ে নেব!’ শ্রীরামপুরে মমতার রূঢ় হুঙ্কার, কুণালের রক্তে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি!

শ্রীরামপুর কোর্টের মাঠে হাইকোর্টের নির্দেশে মিলল জনসভার অনুমতি, তবে সভা শুরু হওয়ার আগে থেকেই রাজ্য রাজনীতির পারদ চড়তে শুরু করেছিল। উত্তরপাড়ায় কুণাল ঘোষের গাড়িতে হামলা, বোনেটে ডিম-ইট-পাথর বৃষ্টি, কর্মীদের গ্রেফতারি আর পুলিশি বাধার অভিযোগ—সমস্ত রাজনৈতিক ঝড়ের আবহ কাটিয়ে শনিবার শ্রীরামপুরের মঞ্চে উঠলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর মাইক হাতে নিয়ে সোজা আক্রমণ শানালেন নির্বাচন কমিশন, বিজেপি ও রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে।
ভোটার তালিকা থেকে ঢালাও নাম ছাঁটাই, গণনায় কারচুপি, এসআইআর প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিরোধী কর্মীদের ওপর দমনপীড়ন—সমস্ত কিছুর দায় সরাসরি বিজেপি চালিত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপান তিনি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ফের ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করে তৃণমূল নেত্রীর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “আপনারা বাংলা দখল করেছেন ঠিকই, কিন্তু আমরা এবার দিল্লি ছিনিয়ে নেব!”
“আমরা হারিনি, জোর করে হারানো হয়েছে”: শ্রীরামপুরের সভা থেকে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নির্বাচনের ফলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, “আমরা হেরে যাইনি, আমাদের চক্রান্ত করে হারানো হয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন, এসআইআর (SIR)-এর দোহাই দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৯২ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আইনি লড়াই চালিয়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে ৩২ লক্ষ নাম ফেরানো গেলেও, পরবর্তীতে আরও ২৭ লক্ষ নাম ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এমনকি কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের আধিকারিক সীমা খান্নার নাম তুলে মমতা অভিযোগ করেন, “বস্তায় করে ৭ লক্ষ ফর্ম ডিলিট করা হয়েছে। ভ্যানিশ কুমারের পেছনে আসল রূপসী সীমা খান্না আর তাঁর পেছনে রয়েছে বিজেপি!”
ইভিএম ও গণনায় কারচুপির অভিযোগ: ভোট গণনার দিন চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন মমতা। তিনি জানান, গণনাকেন্দ্র থেকে জোর করে তৃণমূলের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াই ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছিল। মমতার কথায়, “আমরা উকুন বাছার মতো করে খুঁটিয়ে কাজ করেছি বলেই ওদের এই ভোট চুরির পরিকল্পনাটা ধরা পড়েছিল এবং আমরা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই নিয়ে যেতে পেরেছি।”
দিল্লি দখলের ডাক ও বিরোধী ঐক্যের বার্তা: শ্রীরামপুরের সভার সবথেকে বড় হাইলাইট ছিল আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বিরোধী দলগুলির হাইভোল্টেজ বৈঠকের ইঙ্গিত। তৃণমূল নেত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন যে, এখন আর দলীয় পতাকা বা ভাবাদর্শের রং দেখার সময় নেই। কে লাল, কে নীল, কে হলুদ—তা ভুলে শুধু গণতন্ত্র বাঁচানোর তাগিদে সবাইকে এক ছাতার তলায় আসতে হবে। এমনকি সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হওয়ার খবর নিশ্চিত করে মমতা বলেন, “ভোটে চুরি এখন দেশের সবথেকে বড় ইস্যু। আমি ওনাদেরও বলেছি, আসুন সব ভুলে এবার একসঙ্গে জোট বাঁধুন।”
পুজোর পর ‘দ্বিতীয় বিজয়া দশমী’র হুঁশিয়ারি: সামনেই সার্বজনীন দুর্গাপূজা। পুজো মিটলেই কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে এক বিশাল গণ-আন্দোলনের রূপরেখা প্রকাশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্মীদের চাঙ্গা করে তিনি বলেন, “পূজার পর্বটা শান্তিতে কাটুক, তারপর আমরা রাজনীতির ময়দানে আর একটা দশমী করব! ওদের ভয়ের ফাঁদ ভেঙে বেরিয়ে আসুন, জয় আমাদের হবেই।”
কুণালের ওপর হামলা ও পুলিশকে কড়া বার্তা: শ্রীরামপুরের সভায় আসার পথে উত্তরপাড়ায় কুণাল ঘোষের ওপর আক্রমণের ঘটনায় সুর চড়ান তিনি। কুণাল আহত হওয়ার ঘটনা টেনে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে মমতা বলেন, “তোমরা যদি মানুষের ভোটে জিতেই থাকো, তবে বিরোধীদের সভা-সমাবেশ করতে এত ভয় পাচ্ছ কেন? আর পুলিশদের বলছি, ওভাবে দালালি না করে উর্দি ছেড়ে দিয়ে সোজা বিজেপির ঝান্ডা হাতে তুলে নাও!”
বক্তব্যের একেবারে শেষলগ্নে ভিড়ের মধ্য থেকে একটি ছোট্ট শিশুর কণ্ঠে ‘দিদি’ ডাক ভেসে আসলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মমতা। তিনি বলেন, “আমার সারা শরীরে চোট, কিন্তু আমি জীবন্ত লাশের মতো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। এদের খেলা শেষ না দেখা পর্যন্ত থামব না।” পরম পরিচিত ভঙ্গিতে বক্তব্য শেষ করার আগে তিনি ফের হুঁশিয়ারি দেন, “আগে এই ভ্যানিশ কুমারকে বিদায় করতে হবে, ও ফিনিশ হলেই নতুন খেলা শুরু হবে!”