কোটি টাকার তক্ষক থেকে শিয়ালের মাংস—রোগ মুক্তির অবৈজ্ঞানিক দাবিতে কতটা বিপদ ডেকে আনছেন আপনি?

বাঙালির সমাজে রোগ নিরাময় কিংবা শারীরিক ক্ষমতা বাড়াতে নানা ধরনের টোটকা ও লোকবিশ্বাসের প্রচলন রয়েছে বহু পুরনো দিন থেকেই। এর মধ্যে শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা ভালো হওয়া, তক্ষক দিয়ে হাঁপানি বা যৌনক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ তৈরি কিংবা জোঁকের তেলে কোমরব্যথা সারানোর দাবি আজও গ্রামীণ ও শহরের অলিগলিতে দিব্যি প্রচলিত। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্ত ধারণার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এগুলো সম্পূর্ণভাবেই কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণা মাত্র।

ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে চাহিদার কথা বলে অতীতে চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তক্ষক পাচারের হিড়িক পড়েছিল। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অন্ধবিশ্বাসের জেরে প্রকৃতি থেকে তক্ষকের সংখ্যা যেমন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, তেমনই শিয়াল মারার মতো ঘটনাও আকছার ঘটে চলেছে। যদিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ ও ড. মনিরুল এইচ খান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শিয়ালের মাংস বা তক্ষকের দেহে এমন কোনো ঔষধি গুণ নেই যা রোগ সারাতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও এই তথ্যের সত্যতা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন যে, এগুলির কোনো বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক ফার্মাকোলজিক্যাল ভিত্তি নেই।

আইনি সুরক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ:

  • সংরক্ষিত প্রাণী: বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ অনুযায়ী খেঁকশিয়াল, পাতিশিয়াল এবং তক্ষক—সবকটি প্রাণীই সংরক্ষিত হিসেবে তালিকাভুক্ত। গবেষণা বা অনুমতি ছাড়া এগুলি শিকার, পাচার বা কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

  • লিচ থেরাপির সত্যতা: ইউনানি চিকিৎসায় জোঁক ব্যবহারের প্রাচীন ঐতিহ্য থাকলেও তা সাধারণ জোঁক দিয়ে হয় না। এর জন্য নির্দিষ্ট ‘মেডিকেটেড’ বা চাষ করা জোঁক ব্যবহার করা হয়। তবে বাজারে ফুটপাতে বা হাটবাজারে যে জোঁকের তেল বিক্রি হয়, তার কোনো ঔষধি কার্যকারিতা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা শিয়ালের মাংস বা অপরিশোধিত বন্যপ্রাণীর উপাদান গ্রহণের ফলে শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করতে পারে, যা থেকে বড় ধরনের শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। তাই অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারের বশে বন্যপ্রাণী নিধন এবং অবৈজ্ঞানিক উপাদান ব্যবহারের প্রবণতা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *