এক পরিবারের পাঁচ ভাইয়েরই একটা করে কিডনি গায়েব! আফগানিস্তানের ‘ওয়ান কিডনি ভিলেজ’-এর শিউরে ওঠা সত্যি

বিশ্ব মানচিত্রে এমন এক গ্রামের খোঁজ মিলেছে, যার নাম শুনলেই আতঙ্কে শিউরে উঠতে হয়—’ওয়ান কিডনি ভিলেজ’ বা ‘এক-গুর্দা গ্রাম’। নামটা শুনে কোনো কাল্পনিক গল্প মনে হলেও, এটাই কঠোর বাস্তবতা। এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই একটিমাত্র কিডনি নিয়ে বেঁচে আছেন। কোনো বিরল জন্মগত ত্রুটি বা জটিল শারীরিক অসুস্থতার কারণে নয়, বরং স্রেফ এক মুঠো খাবারের জোগাড় করতে এবং চরম দারিদ্র্যের হাত থেকে পরিবারকে বাঁচাতে নিজেদেরই একটি অঙ্গ বিক্রি করে দিয়েছেন গ্রামবাসী।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই শিউরে ওঠার মতো দৃশ্যপট।

কোথায় অবস্থিত এই ‘ওয়ান কিডনি ভিলেজ’?

আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ‘সাইশানবা বাজার’ নামের একটি বস্তিসদৃশ গ্রাম। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, সংঘাত ও চরম অর্থকষ্টে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে এলাকাটি বিশ্বজুড়ে ‘ওয়ান কিডনি ভিলেজ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই অন্তত একজন সদস্য বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। দারিদ্র্যের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র যে, এখানকার এক পরিবারের পাঁচ ভাই গত চার বছরে প্রত্যেকেই নিজেদের একটি করে কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন!

আইনের ফাঁক ও নজরদারির অভাব

আফগানিস্তানে অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা অঙ্গ বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করার মতো কঠোর কোনো আইনি কাঠামো নেই। হেরাতের কয়েকটি হাসপাতালে নিয়মিত এই ধরনের কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার চলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসকদের দাবি, অস্ত্রোপচারের আগে দাতার থেকে স্রেফ একটি লিখিত অনুমতিপত্র এবং ভিডিও রেকর্ডিং রাখা হয়। রোগী ও দাতার মধ্যে কীভাবে টাকার চুক্তি হচ্ছে বা তারা কোথা থেকে আসছেন, তা খতিয়ে দেখা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাজ নয় বলেই তাঁরা হাত ধুয়ে ফেলেন।

দাম কমেছে অঙ্গের, বেড়েছে দালালের দাপট

আফগানিস্তানে তালেবান শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক সংকট বহুগুণ বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মানব অঙ্গের বাজারেও। পূর্বে যেখানে একটি কিডনি বিক্রি করে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পাওয়া যেত, এখন চরম অবক্ষয়ের দরুন অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ১,৫০০ ডলারেও (ভারতীয় মুদ্রায় যা দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি) কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন নিরুপায় মানুষেরা।

কালোবাজারের দালাল ও ধনী রোগীরা অল্প দামে অঙ্গ পাওয়ার আশায় সুযোগ নিয়ে এই বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলিতে ঘুরে বেড়ায়। সরকারি নথিতে গত ৫ বছরে প্রায় ২৫০টি প্রতিস্থাপনের হিসেব থাকলেও, বেসরকারি ও অনথিভুক্ত অস্ত্রোপচারের প্রকৃত সংখ্যা বহু শতক ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ক্ষুধার জ্বালা ও ঋণের বোঝা মেটাতে শরীরের অঙ্গ বিক্রি করে দেওয়ার এই করুণ চিত্র আজ বিশ্বমঞ্চে আফগানিস্তানের মানবিক সংকটের এক চরম এবং হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *