চা শ্রমিকদের পিতে হাত? এক বছরেই কোপ! ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থেকে এফআইআর, কাঁপছে উত্তরবঙ্গ

মাসের শেষে বেতন থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে টাকা, কিন্তু জমার খাতায় তা শূন্য! প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিএফ (PF) নিয়ে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানগুলিতে শ্রমিক বঞ্চনার এই পুরনো ছবি বদলাতে এবার বেনজিরভাবে রুখে দাঁড়াল প্রশাসন। জলপাইগুড়ি রিজিওনাল প্রভিডেন্ট ফান্ড দফতর এখন খেলাপি বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এফআইআর (FIR), গ্রেফতারি পরোয়ানা থেকে শুরু করে সোজা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষেই বকেয়া আদায়ের অঙ্ক ছাড়িয়ে গিয়েছে ১১ কোটি টাকার গণ্ডি। শুধু তাই নয়, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রেকর্ড ৪২ কোটি টাকা উদ্ধার করে গোটা রাজ্যের মধ্যে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে জলপাইগুড়ি রিজিওনাল পিএফ দফতর।

কোন কোন নামী বাগানের বিরুদ্ধে কড়া কোপ?

শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা না করার অভিযোগে জলপাইগুড়ি পিএফ দফতর গত ছয় বছরে প্রায় ৪০টি চা-বাগানের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে। চলতি ২০২৬ সালেই ৬টি বড় চা-বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর দায়ের হয়েছে। একই সঙ্গে ২০টিরও বেশি গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং ২০টিরও বেশি ব্যাংকিং লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ বা ফ্রিজ করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

পিএফ দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোন বাগান কত বকেয়া রেখেছে তার চাঞ্চল্যকর তালিকা:

  • নিমতিঝোড়া টি এস্টেট: কর্মচারীদের বেতন থেকে কাটা ১ কোটি ৫৩ লক্ষ ৮১ হাজার ১২৯ টাকা পিএফ অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি।

  • চিঞ্চুলা টি এস্টেট: ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে ১ কোটি ৫ লক্ষ ৩ হাজার ৪৩ টাকা পিএফ বাবদ কেটে রাখা হলেও তা গায়েব।

  • তাসাটি টি এস্টেট: আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটার এই বাগানে শ্রমিকদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৭৬ লক্ষ ২৯ হাজার ৯৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।

  • সুভাষিনী টি এস্টেট: কেটে নেওয়া ৭৫ লক্ষ ৪১ হাজার ৯৯৩ টাকা জমা দেওয়া হয়নি পিএফ দফতরে।

এছাড়া মেসার্স গারগান্ডা ও মেসার্স তুলসীপাড়া টি এস্টেটের মতো প্রভাবশালী বাগানগুলির বিরুদ্ধেও মামলা রুজু হয়েছে।

“কোনো ছাড় নয়,” স্পষ্ট বার্তা কমিশনারের

জলপাইগুড়ি রিজিওনাল পিএফ কমিশনার পবন কুমার বনসল স্পষ্ট জানান, উত্তরবঙ্গের প্রায় ৩০০টি চা-বাগানের কয়েক লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িত এই পিএফ-এর টাকার ওপর। তিনি বলেন, “শ্রমিকদের রক্তজল করা উপার্জন কেটে জমা না দেওয়া গুরুতর অপরাধ। আমরা নোটিস পাঠিয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। বকেয়া আদায়ের পাশাপাশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বাতিল ও গ্রেফতারির নোটিস জারি চলছে। শ্রমিকদের প্রাপ্য বঞ্চনা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।”

চড়ছে রাজনীতির পারদ

উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি যে চা শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের পিএফ বঞ্চনার জল গড়িয়েছে রাজনৈতিক অলিন্দেও। আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গাও এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি জানান, পিএফ দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে কড়া পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে এবং দোষী মালিকদের কোনোভাবেই রেয়াত করা উচিত নয়।

শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে পিএফ দফতরের এই ‘আগ্রাসী ফর্মুলা’ উত্তরবঙ্গের চা বলয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *