বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে বসানো হল জিন্নার ছবি, পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ছে বাংলাদেশে?

বাংলাদেশ ও রাজনীতির অন্দরে ফের দানা বেঁধেছে নতুন বিতর্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু (DUCSU) মিউজিয়ামে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছবি সরিয়ে সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলি জিন্নার ছবি টাঙানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও সংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান পুরুষকে সরিয়ে পাক প্রতিষ্ঠাতার ছবি প্রদর্শনের এই পদক্ষেপে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ পড়ুয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের একাংশ। ঘটনার জেরে সোমবার মিউজিয়ামে ঢুকে জিন্নার ছবি নামিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার পর সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ডাকসু মিউজিয়াম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা, সহ-সভাপতি শাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদসহ ছাত্র সংসদের অন্যান্য প্রতিনিধিরা।
সংস্কারের আগে এই সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত শেখ মুজিবের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও অবদানের ছবি সযত্নে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু সংস্কারের পর সেই ছবিগুলির বেশিরভাগই আর দেখা যাচ্ছে না। উল্টে মিউজিয়ামে অন্তত তিনটি ভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে মহম্মদ আলি জিন্নার ছবি স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে ১৯৪৮ সালে উর্দুর পক্ষে জিন্নার বিতর্কিত বক্তব্য এবং ১৯৪০ সালের মুসলিম লিগের সম্মেলনের ছবিও রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের সাফাই ও ছাত্র বিক্ষোভ
ডাকসু নেতৃত্বের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর যাঁদের ফ্যাসিবাদের আইকন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তাঁদের ছবিই সরানো হয়েছে। জিন্নার ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য তাঁকে মহিমান্বিত করা নয়, বরং ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় নথিভুক্ত করা বলে দাবি করেছেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।
তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ প্রতিবাদী পড়ুয়ারা। আবু তাইয়েব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী সোমবার সরাসরি মিউজিয়ামে ঢুকে জিন্নার তিনটি ছবি নামিয়ে ফেলেন। তাঁর প্রশ্ন, বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করা এবং কার্জন হলে ছাত্রদের গ্রেফতারে নির্দেশদাতা জিন্নার ছবি কীভাবে বাংলাভাষীদের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে? বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির সমর্থিত নেতৃত্ব বিতর্কিত ঐতিহাসিক চরিত্রদের পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদলও। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামির প্রয়াত নেতা গোলাম আযমের ছবি টাঙানোর অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তদন্তের নির্দেশ ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মহম্মদ তানজিমউদ্দিন খানসহ বিশিষ্টজনেরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই সমস্ত ঘটনার জেরে নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অনুমোদনহীন স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি, শিক্ষক মূল্যায়নের বিতর্কিত ওয়েবসাইট চাল এবং জিন্নার ছবি প্রদর্শনের মতো বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের অভিযোগ, ডাকসুর এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ ক্যাম্পাসে একটি সমান্তরাল প্রশাসন চালুর অপচেষ্টা বৈকি কিছু নয়। নিয়মভঙ্গের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।