সিআইডির নজরে এবার ‘মানি ট্রেল’! অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত-সহায়কের ঘাড়ে কোন বড় বিপদ?

শালবনির জমি জালিয়াতি কাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে এক সুসংগঠিত ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক ধাঁচের অপরাধ চক্র। এতদিন কেবল বেআইনি দখল ও ভুয়া নথিপত্র তৈরিই ছিল তদন্তের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু, তবে এবার তাতে যুক্ত হয়েছে কোটি কোটি টাকার বেআইনি লেনদেনের গতিপথ বা ‘মানি ট্রেল’। রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডির দাবি, উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দ জমি হাতবদল করে উপার্জিত বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি পৌঁছে যেত তৃণমূল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত-সহায়ক সুমিত রায়ের দফতরে।

তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, পুরো কেলেঙ্কারিটি কেবল কোনো একটি অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন জমি দখলের ঘটনা নয়। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রথমে এলাকায় উদ্বাস্তুদের সরকারি জমি চিহ্নিত করা হতো। পরবর্তীতে ভুয়া কাগজ বানিয়ে জমিটি নিজেদের নামে দেখিয়ে তা চড়া দামে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। অর্জিত টাকার এক-তৃতীয়াংশ স্থানীয় স্তরে বণ্টন করার পর বাকি সিংহভাগ অর্থ প্রভাবশালী স্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ।

সাক্ষীদের বিস্ফোরক জবানবন্দি ও আর্থিক সূত্র

শালবনি কেলেঙ্কারিতে কীভাবে টাকা সুমিত রায়ের দফতরে পৌঁছাত, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ মিলছে সিআইডির হাতে থাকা বয়ান থেকে:

  • সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি: দীর্ঘদিন প্রাণভয়ে নীরব থাকলেও সৈয়দপুর গ্রামের দুই বাসিন্দা সিআইডিকে নিশ্চিত করেছেন যে, তৎকালীন বিধায়ক সুজয় হাজরা এবং সুমিত রায়ের মধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন চলত।

  • বিধায়কের ঘনিষ্ঠদের স্বীকারোক্তি: সুজয় হাজরার হয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা দুজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি জেরায় স্পষ্ট স্বীকার করেছেন যে, জমি বিক্রি থেকে আসা কোটি কোটি টাকার ভাগ তাঁরা নিয়মিত সুমিত রায়ের অফিসে নিয়ে যেতেন।

  • নিরাপত্তারক্ষীদের বয়ান: আলিপুরদুয়ার ও নদীয়ার বাসিন্দা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন দুই পার্সোনাল সিকিউরিটি অফিসার (PSO)-এর বয়ানেও সুমিত রায়ের সক্রিয় ভূমিকা থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।

তদন্তে মূল অগ্রাধিকার ‘টাকার গন্তব্য’

বর্তমানে সিআইডি মূলত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে মরিয়া: কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে? টাকা নগদে ট্র্যান্সফার হয়েছিল নাকি অনলাইন মাধ্যমে? কত টাকা এবং ঠিক কার নির্দেশে এই ট্রানজ্যাকশনগুলো সম্পাদন করা হয়েছিল? সাক্ষীদের লিখিত জবানবন্দি এবং বাজেয়াপ্ত ব্যাংক নথির মাধ্যমে সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এখন মেলাচ্ছেন সিআইডি কর্তারা।

উদ্বাস্তুদের জমি কেড়ে শুরু হওয়া এই জালিয়াতি সাম্রাজ্যের শিকড় যে অনেক গভীরে প্রোথিত, তা সিআইডির এই নয়া পদক্ষেপেই স্পষ্ট। অপরাধের প্রতিটি ধাপ এবং নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের চিহ্নিত করতেই এখন গতি বাড়ানো হয়েছে শালবনি-কাণ্ডের তদন্তে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *