রাজনীতির অলিন্দে ভাই বনাম উত্তরাধিকারের লড়াই! মায়াবতীর এই একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে চলেছে বসপার ভবিষ্যৎ

বহুজন সমাজ পার্টি বা বসপার (BSP) অন্দরে পারিবারিক কলহ ও ক্ষমতার লড়াই যেন থামার নামই নিচ্ছে না। গত মাত্র দশদিনের ব্যবধানে দলের সুপ্রিমো মায়াবতী নিজের পরিবার ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে একের পর এক চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমে আকাশ আনন্দকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া, তারপর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার এবং সর্বশেষ ছোট ভাই আনন্দ কুমারের দুই ছেলেকে দল থেকে দূরে সরিয়ে भतीजी বা ভাইঝিকে সামনে নিয়ে আসার মতো একের পর এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে উত্তাল উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি। এই পুরো পারিবারিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে বর্তমানে আলোচনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটিমাত্র নাম— আনন্দ কুমার।
কে এই আনন্দ কুমার এবং কেন তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ?
মায়াবতীর ছোট ভাই আনন্দ কুমার বর্তমানে বসপার জাতীয় সহ-সভাপতি পদে আসীন রয়েছেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নয়ডার এক সরকারি দপ্তরে সামান্য ক্লার্কের চাকরি করতেন। ২০০৭ সালের পর থেকেই মূলত তিনি বোন মায়াবতীর ছায়াসঙ্গী হিসেবে দলের সমস্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম ও নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। এমনকি আকাশ আনন্দকে রাজনীতিতে নিয়ে আসার পেছনেও বড় ভূমিকা ছিল এই আনন্দ কুমারেরই। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মায়াবতীর ঠিক পরেই সংগঠনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হলেন এই আনন্দ কুমার। দলের সমস্ত পদাধিকারীরা সরাসরি তাঁকে রিপোর্ট করেন এবং সেই রিপোর্ট খোদ মায়াবতীর সামনে পেশ করেন।
কেন ভাই আনন্দ কুমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না মায়া?
পরিবারের বাকি সদস্যদের ক্ষেত্রে মায়াবতী একের পর এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেও ভাই আনন্দ কুমারকে নিয়ে তাঁর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই নীরবতার পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ:
১. সাংগঠনিক ক্ষমতা: দলের সংবিধান অনুযায়ী সভাপতি বা মায়াবতীর অনুপস্থিতিতে আনন্দ কুমারই বৈঠক ডাকা এবং যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখেন। এই মুহূর্তে তাঁকে সরিয়ে দিলে দলের অন্দরে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
২. অর্থনৈতিক প্রভাব: ২০১৯ সালে আনন্দ কুমারের বিভিন্ন ঠিকানায় আয়কর হানা হয়েছিল। সেই সময় তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৩০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে অনুমান করেছিল আইটি বিভাগ এবং প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বেনামি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে, এই মুহূর্তে গোটা বসপা দলের আনুষ্ঠানিক সম্পত্তি প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, দলের চেয়েও অনেক বেশি আর্থিক শক্তির অধিকারী আনন্দ কুমার।
৩. আস্থা ও নির্ভরতা: সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে মায়াবতী নিজে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, একজন নারী নেত্রী হিসেবে তাঁর পাশে সবসময় একজন বিশ্বস্ত সহযোগীর একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি এও স্বীকার করেন যে, তিনি যদি কনসীরামের মতো পুরুষ হতেন, তবে হয়তো নিজের ভাইকেও রাজনীতিতে আনতেন না। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই তিনি ভাই আনন্দ কুমারকে নিজের পাশে রেখেছেন, যদিও তাঁর সন্তানদের দলীয় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, মায়াবতীর এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলি বসপার অন্দরে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে।