পোষ্য নয়, ভাইয়ের মতো ভালোবাসত! ১২ বছরের কুকুরের মৃত্যুর পর যা করল পরিবার, দেখলে চোখে জল আসবে

উত্তরপ্রদেশের মেরঠে পোষ্য কুকুরের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য ও আবেগঘন দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। পরিবারের সদস্যের মতো দীর্ঘ ১২ বছর ধরে সঙ্গে থাকা ‘টাফ্ফু’ নামের একটি পোষ্য কুকুরের প্রয়াণে সম্পূর্ণ শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবার। মানুষের মতোই টাফ্ফুর জন্য তেরো দিনের শ্রাদ্ধ ও ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। পরিবারের কাছে টাফ্ফু কেবল কোনো পোষ্য প্রাণী ছিল না, বরং দীর্ঘ এক যুগের সম্পর্কের পর সে হয়ে উঠেছিল পরিবারেরই একজন অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মেরঠের বাসিন্দা সুনীল যাদবের পরিবারে প্রায় ১২ বছর ধরে ছিল টাফ্ফু। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা এই পোষ্যটির সঙ্গে প্রতিটি সদস্যের নিবিড় আবেগ ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বাড়ির অন্যান্যদের মতোই টাফ্ফুর ছিল পারিবারিক জীবনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ফলে তার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা পরিবারে।
তিন দিন ধরে বন্ধ ছিল রান্নাবান্না
টাফ্ফুর মৃত্যুর পর শোকে এতটাই পাথর হয়ে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা যে টানা তিন দিন বাড়িতে কোনো রান্না পর্যন্ত হয়নি। প্রিয় বন্ধু ও সদস্যকে হারানোর কষ্টে তাঁরা কার্যত গভীর শোক পালন করেন। পরিবারের কাছে এই মৃত্যু ছিল ঠিক কোনো আপনজনকে হারানোর বেদনার মতোই।
মানুষের মতোই তেরো দিনের শ্রাদ্ধ ও যজ্ঞ
প্রিয় পোষ্যের প্রয়াণে কেবল শেষকৃত্য সম্পন্ন করেই দায়িত্ব সারেনি পরিবার, বরং তার স্মরণে জাঁকজমকপূর্ণভাবে তেরো দিনের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে হোম-যজ্ঞের পাশাপাশি টাফ্ফুর আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যরা টাফ্ফুর সঙ্গে কাটানো বহু পুরনো সোনালী মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করেন। তার মিষ্টি স্বভাব, পরিবারের সবার সঙ্গে তার খুনসুটি এবং দীর্ঘ ১২ বছরের নানা স্মৃতিচারণায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মেয়ের কাছে ছিল ভাইয়ের মতো
পরিবারের কন্যা বর্ষার সঙ্গে টাফ্ফুর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বিশেষ। বর্ষার কাছে টাফ্ফু পোষ্যের গণ্ডী ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছিল তার নিজের ছোট ভাইয়ের মতো। দীর্ঘদিন একই ছাদের নিচে বসবাস করার কারণে দুজনের মধ্যে এক আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল। ফলে টাফ্ফুরের মৃত্যু বর্ষার কাছে এক চরম মানসিক আঘাত হয়ে আসে। পরিবারের সদস্যদের মতে, টাফ্ফুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি। তার সারা বাড়ির অবাধ বিচরণ এবং প্রতিদিনের খুনসুটি এখন কেবলই এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য ও সমাজের প্রশংসা
পরিবারের কোনো সদস্যের প্রয়াণে যে ধরনের শেষকৃত্যের আচার-অনুষ্ঠান করা হয়, টাফ্ফুটিকেও ঠিক তেমনই পূর্ণ মর্যাদায় বিদায় জানানো হয়। এরপর তার স্মরণে আয়োজিত তেরহভির অনুষ্ঠানে পরিবারের পাশাপাশি বহু প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন অংশ নেন। মেরঠের এই মানবিক ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও গভীর আবেগের সৃষ্টি হয়। অনেকেই পরিবারের এই মহৎ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, মানুষের জীবনে পোষ্যরা যে কতটা গভীর ও স্থান অধিকার করতে পারে, মেরঠের এই ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল দলিল।
আজকের দিনে বহু পরিবারেই পোষ্যদের কেবল শখ বা নিরাপত্তার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না; বরং কুকুর কিংবা বিড়াল ধীরে ধীরে পরিবারেরই মূল চালিকাশক্তি ও সদস্য হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে তৈরি হয় এক অটুট মানসিক সম্পর্ক। টাফ্ফুরের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই ঘটেছিল। ১২ বছর ধরে পরিবারের প্রতিটি সুখ-দুঃখে পাশে থাকার কারণে সে দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই তার প্রয়াণে শোক পালন থেকে শুরু করে তেরহভির আয়োজন—সবকিছুর মাধ্যমেই তাকে পরিবারের প্রকৃত সদস্যের সম্মান জানানো হয়েছে। মেরঠের এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল, মানুষ ও পোষ্যের সম্পর্ক কেবল মালিক ও পশুর নয়, বরং তা অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি গভীর ও মধুর হয়ে উঠতে পারে।