যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির নতুন দিশা! ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ফিলিস্তিন ও ইরান নিয়ে বড় বার্তা ভারতের

নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের জন্ম দিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে ‘নয়া দিল্লি ঘোষণা ২০২৬’। সম্মেলন শুরুর আগে পশ্চিম এশিয়া সংকট নিয়ে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর অবস্থান এতটাই পরস্পরবিরোধী ছিল যে, একটি যৌথ খসড়ায় পৌঁছানো অসম্ভব ঠেকেছিল। তবে সমস্ত জল্পনা ও কূটনৈতিক বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতি আদায় করেছে নয়াদিল্লি। আর এই ঘোষণাপত্রের খসড়ায় এমন পাঁচটি বড় বিষয় সামনে এসেছে, যা সরাসরি ইরানের অনুকূলে এবং একে ইসরায়েল ও আমেরিকার জন্য বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

১. পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার তীব্র বিরোধিতা
নয়া দিল্লি ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইরানের পরমাণু ও নাগরিক পরিকাঠামোয় হামলার তীব্র নিন্দা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (IAEA)-এর সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে থাকা শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলায় ইরানের বিভিন্ন পরমাণু ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সংঘাত চরমে পৌঁছেছিল। প্রত্যক্ষভাবে দুই দেশের নাম নেওয়া না হলেও, ব্রিকস মঞ্চের এই অবস্থান তেহরানের জন্য বিরাট কূটনৈতিক স্বস্তি।

২. লেবनान থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি
লেবানন সংকট নিয়ে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছে ব্রিকস। ইজরায়েলকে অবিলম্বে লেবাননি এলাকা থেকে তাদের দখলদার সেনা সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব কঠোরভাবে মেনে চলা এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকেও বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

৩. জেরুজালেমের মর্যাদায় একতরফা পরিবর্তনের বিরোধিতা
পবিত্র শহর জেরুজালেমের ঐতিহাসিক ও আইনি অবস্থাকে একপেশেভাবে বদলানোর যেকোনো প্রচেষ্টাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ব্রিকস জোট। শহরটির সমস্ত ধর্মীয় ও পবিত্র স্থানের মর্যাদার পূর্ণ সম্মান রক্ষা এবং সব ধর্মের মানুষের নির্বিঘ্নে প্রার্থনার অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে, যা সরাসরি ইজরায়েলি নীতির বিরোধিতা করে।

৪. ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সমর্থন ও দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্বের জোরালো সওয়াল
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ বা টু-স্টেট সলিউশনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করা হয়েছে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ এবং সমস্ত আন্তর্জাতিক সংস্থায় তাদের সঠিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যেকোনো অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা করেছে ব্রিকস।

৫. মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইরান বৈঠক
বৈরী সম্পর্ক ভুলে এই সম্মেলনের মঞ্চেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ ও ইরানের রাষ্ট্রপতির হাই-প্রোফাইল বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। বৈরিতা ভুলে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশের এই সখ্যতা পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরানোর পথ আরও প্রশস্ত করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *