ভারত থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা? আসল সত্যিটা জানলে চমকে উঠবেন!

ভারতীয় শেয়ার বাজার নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে প্রায়শই একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—বিদেশি পোর্টফোলিও বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FII) কি তবে ভারত ছাড়ছেন? চলতি বছরে ইতিমধ্যেই তাঁরা পুরোনো তালিকাভুক্ত বা লিস্টেড কোম্পানিগুলির প্রায় ২.৮ লক্ষ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। এই ভারী বিকভৃতির জেরে অনেকেরই মনে হতে পারে যে বিদেশি ফান্ডগুলি বুঝি ভারতীয় বাজার থেকে পলায়ন করছে। কিন্তু খবরের কাগজের এই হেডলাইনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক দারুণ ও রোমাঞ্চকর অর্থনৈতিক সত্য। সত্যিটা হলো, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত ছেড়ে পালাচ্ছেন না, বরং তাঁরা টাকা লাগানোর স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন। এক দিকে যেমন তাঁরা পুরোনো শেয়ার ঝেড়ে ফেলছেন, তেমনই অন্যদিকে আইপিও (IPO)-র দুনিয়ায় ৪৭,০০০ কোটি টাকারও বেশি দুর্দান্ত বিনিয়োগ করেছেন।

পুরোনো কোম্পানিগুলোর ওপর কেন কমছে ভরসা?
Kotak Neo
স্যামকো সিকিউরিটিজের (SAMCO Securities) ইক্যুইটি রিসার্চ অ্যানালিস্ট রাজ গায়করের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে টাকা গুটিয়ে চলে যাচ্ছেন না, তাঁরা কেবল বিনিয়োগের প্যাটার্ন পরিবর্তন করছেন। এই ট্রেন্ড নতুন কিছু নয়, এর আগেও ২০২৪ সালে ১.২১ লক্ষ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৭৪,০০০ কোটি টাকার প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগ করেছিল তারা।

বর্তমানে পুরোনো লিস্টেড কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বিদেশিদের কাছে বেশ চড়া বা ব্যয়বহুল বলে মনে হচ্ছে। পাশাপাশি, বড় কোম্পানিগুলোর আয়ের গতিও কিছুটা শ্লথ হয়েছে। এই কারণে তাঁরা পুরোনো হোল্ডিং বা শেয়ারের পরিমাণ ক্রমাগত কমিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে ব্যাঙ্কিং বা ফিনান্সিয়াল সার্ভিস, অটোমোবাইল, তেল ও গ্যাস খাতের মতো সেক্টর থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। শুধুমাত্র জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে একা ফিনান্স সেক্টর থেকেই ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি পুঁজি তুলে নেওয়া হয়েছে।

সেকেন্ডারি বাজার ছেড়ে কেন আইপিও-র প্রেমে পড়ছেন বিদেশিরা?
Kotak Neo
ওপেন মার্কেট বা খোলা বাজার থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনতে গেলে বড়সড় সমস্যার মুখে পড়তে হয়। কারণ অতিরিক্ত কেনার চাপে হুট করে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা বিদেশি ফান্ডগুলোর জন্য লাভজনক হয় না।

এ প্রসঙ্গে আনন্দ রাঠি শেয়ার্সের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর তনভী কাঞ্চন জানান, প্রাইমারি মার্কেট বা আইপিও-র মাধ্যমে অ্যাঙ্কর কোটার জেরে একবারে নির্দিষ্ট দামে ও অনেক সহজে বড় অঙ্কের শেয়ার কিনে নেওয়া যায়। এর ফলে বাজারের প্রতিদিনের উত্থান-পতনের সরাসরি কোপ তাঁদের ক্রয়ের ওপর পড়ে না।

কোন নতুন সেক্টরগুলোর দিকে নজর ঘুরছে?
ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক বা আইটি সেক্টরের গ্রোথ বা বৃদ্ধি আগের মতো আর আকর্ষণীয় ঠেকছে না। সেই কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং, কনভেশনাল বা কনজ্যুমার টেক এবং রিন্যুয়েবল এনার্জির মতো একেবারে নতুন ও সম্ভাবনাময় সেক্টরগুলির দিকে ঝুঁকছেন। এই সমস্ত উদীয়মান খাতের নতুন কোম্পানিগুলো যখন বাজারে আসছে, তখন সেগুলিতে টাকা ঢালার সবচেয়ে পরিষ্কার ও সহজ রাস্তা হল আইপিও।

সামনেই রয়েছে বড় বড় আইপিও-র হাতছানি

বর্তমানে ভারতীয় আইপিও বাজার বেশ চনমনে ও গরম রয়েছে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (SEBI)-র কাছে প্রায় ৪.৭ লক্ষ কোটি টাকার আইপিও পাইপলাইনে রয়েছে। আগামী দিনে জিও প্ল্যাটফর্মস, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) এবং ফোনপে-র মতো হেভিওয়েট কোম্পানির আইপিও বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সমস্ত বড় নামগুলির সুবাদেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ তুঙ্গে রয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, এই আইপিও জোয়ারে শুধু বিদেশিরাই নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ দেশীয় বিনিয়োগকারী এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলিও সমানভাবে বাজার মাতিয়ে রাখছে।

(ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত পরিবেশনার জন্য। এটিকে কোনোভাবেই সরাসরি বিনিয়োগের আর্থিক পরামর্শ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি সাপেক্ষ।)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *