প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে আটকে গেল মায়ের ভোগ! বামাক্ষ্যাপার এক হুঙ্কারে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল তারাপীঠে?

সাধক বামাক্ষ্যাপা কোনো কঠিন শাস্ত্র মানতেন না, নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা ছিলেন না। তাঁর কাছে দেবী তারা ছিলেন রক্তমাংসের এক জন্মদাত্রী মা। মায়ের একটু কষ্ট হলেও তাঁর বুক ফেটে যেত। এই মহাসাধককে নিয়ে তারাপীঠের আনাচে-কানাচে অজস্র রোমহর্ষক ঘটনা ঘুরে বেড়ায়। তবে তার মধ্যে যে কাহিনিটি আজও ভক্তদের মনে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে, তা হল প্রবল ঝড়-বৃষ্টিকে এক নিমেষে বশ মানানোর সেই অলৌকিক মুহূর্তের লোকগাথা।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, সেদিন ছিল তারাপীঠের এক বিশেষ উৎসবের দিন। সকাল থেকেই শ্মশান চত্বরে ভক্তদের ভিড় জমলেও বিকেল গড়াতেই হঠাৎ হাওয়া বদলে যায়। উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ধেয়ে আসে এক রাশ কালচে মেঘ। চোখের পলকে দিনের আলো মুছে গিয়ে চারপাশ ঘোর অন্ধকারে ঢেকে যায়। গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার মতো সাঁ সাঁ করে বইতে থাকে পাগল হাওয়া। সঙ্গে কানফাটানো মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের চমক। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ ভেঙে নামে মুষলধারে বৃষ্টি।
তখনকার তারাপীঠ আজকের মতো চকচকে মার্বেল পাথরের মন্দির ছিল না। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ছিল মাটির দেওয়াল আর ওপরে খড়ের তৈরি এক নড়বড়ে চালা। সেই চালার ফুটো দিয়ে ঘরের ভেতর অবিরল ধারায় জল পড়তে শুরু করে। মাটির মেঝে ভিজে একাকার হয়ে যাওয়ায় প্রদীপ জ্বালাতে গেলেই দমকা বাতাসে তা নিভে যায়। সবচেয়ে বড় বিপদ ঘটে মায়ের ভোগ নিয়ে। এমন দুর্যোগে ভোগ চড়ানো তো দূরের কথা, মায়ের সামনে থালা সাজিয়ে দেওয়াই অসম্ভব হয়ে ওঠে। মন্দিরের পুরোহিত আর সেবায়েতরা তখন চরম অসহায় হয়ে পড়েন। সবার মনে কেবল একটাই চিন্তা, তবে কি আজ মায়ের ভোগ বন্ধ থাকবে? মা কি উপোস করেই থাকবেন?
এদিকে কিছু দূরে, শ্মশানের এক বিরাট গাছের তলায় বসেছিলেন বামাক্ষ্যাপা। পরনে লাল চেলি, ধুলোমাখা শরীর আর চোখে এক অদ্ভুত ঘোর। সামনে জ্বালানো ছিল তাঁর চেনা ধুনো। কিন্তু বৃষ্টির ছাঁট এসে সেই ধুনোর আগুনও বারবার নিভিয়ে দিচ্ছিল। চারদিকের হাহাকার আর পুরোহিতদের ব্যাকুল চিৎকার ভেসে আসতেই তিনি আসল বিষয়টি বুঝতে পারেন। ক্ষ্যাপা বাবার মনে হয়, প্রকৃতির এই রোষের জন্য তাঁর নিজের মা আজ খেতে পাচ্ছেন না! আর এই কথাটি মাথায় ঢুকতেই তাঁর শান্ত রূপ পলকে বদলে যায়।
লোককথা অনুযায়ী, বামাক্ষ্যাপা আর এক মুহূর্তও বসে থাকেননি। ধড়মড় করে তিনি উঠে দাঁড়ান। কাদা-জল ভেঙে শ্মশানের বুক চিরে সোজা এগিয়ে আসেন ফাঁকা জায়গায়। তাঁর দু’টি চোখ তখন যেন জ্বলন্ত অঙ্গার, সর্বাঙ্গ কাঁপছে এক অদ্ভুত শক্তিতে। দুই হাত তিনি আকাশের দিকে ছুড়ে দেন। তারপর বুক চিরে বের করে আনেন এক প্রলয়ংকর হুংকার—‘জয় তারা! জয় তারা!’
জনশ্রুতি, সেই ডাকের তীব্রতায় উপস্থিত মানুষজন তো বটেই, বনের পশুপাখিরাও যেন থমকে গিয়েছিল। মেঘের গর্জনকেও যেন নিমেষে ছাপিয়ে যায় এক সন্তানের সেই আর্তি। আর ঠিক তার পরেই ঘটেছিল সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য! যেন কোনো অদৃশ্য জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায়, সাঁ সাঁ করে ছুটে চলা ঝোড়ো হাওয়া এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যায়। মন্দির চত্বরের ঠিক মাথার ওপর জমে থাকা ঘন কালো মেঘগুলো যেন চিরে গিয়ে দু’পাশে সরে যেতে শুরু করে। চারপাশের গ্রামগুলোতে মুষলধারে জল পড়ছে, অথচ অবাক কাণ্ড, মন্দিরের খড়ের চালের ওপর বৃষ্টির একটি ফোঁটাও আর নামল না! প্রচলিত বিশ্বাস, মনে হয়েছিল কে যেন গোটা তারাপীঠ মন্দিরকে এক বিশাল অদৃশ্য ছাতা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।
সেবায়েতরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। ভিজে ভিজে নিভে যাওয়া প্রদীপগুলো আবার জ্বলে ওঠে। ঢাকের কাঠি আর শাঁখের গগনভেদী সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। গরম গরম খিচুড়ি আর প্রসাদ মায়ের সামনে সাজিয়ে পরম তৃপ্তিতে আরতি সম্পন্ন হয়। লোকমুখে প্রচলিত, বামাক্ষ্যাপা নাকি আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে কড়া হুকুম দিয়েছিলেন, যতক্ষণ না আমার মা পেটভরে খাচ্ছেন, ততক্ষণ তুই এক ফোঁটা জলও নিচে ফেলবি না!
মায়ের ভোগ নিবেদন শেষ হয়, সেবায়েতরা ভোগ নামিয়ে রাখেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বামাক্ষ্যাপা দূর থেকেই বুঝতে পারেন, মা এবার তৃপ্ত। তিনি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আবার ফিরে যান শ্মশানের সেই গাছের তলায়। আর তিনি নিজের আসনে বসতেই ঘটে আর এক আশ্চর্য ঘটনা—আকাশ ভেঙে ফের তুমুল বৃষ্টি আছড়ে পড়ে গোটা তারাপীঠের ওপর। তবে ততক্ষণে মায়ের সেবা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে।
যাঁরা বিজ্ঞানের যুক্তি খোঁজেন, তাঁদের কাছে এটি হয়তো কেবলই আবহাওয়ার একটি আচমকা পরিবর্তন কিংবা ভক্তদের আবেগঘন লোককাহিনি। তবে তারাপীঠের সাধারণ ভক্তদের কাছে এটি কেবল গল্প নয়, বরং সন্তানের প্রতি মায়ের আর মায়ের প্রতি সন্তানের এক অসীম আত্মিক বন্ধনের প্রতীক। ভক্তদের বিশ্বাসে, ভক্তি যে প্রকৃতির রুদ্ররূপকেও শান্ত করতে পারে, এই লোকগাথা যেন তারই প্রতীক। আজও কঠিন বিপদে পড়লে সেই বিশ্বাস বুকে নিয়েই পরম শ্রদ্ধায় ডেকে ওঠেন ভক্তরা, ‘জয় তারা!’