নেপাল ট্র্যাজেডি থেকে বড় শিক্ষা! পাহাড়ের ধস নামার আগেই মোবাইলে বাজবে বিপদের অ্যালার্ম, বড় সিদ্ধান্ত নবান্নের

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বড় শিক্ষা নিয়ে এবার পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করে তুলতে বড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা জিএসআই-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে একটি সমঝোতাপত্র বা এমওইউ (MoU) স্বাক্ষর করেছে রাজ্য, এমনটাই খবর মিলছে নবান্ন সূত্রে। মূলত দার্জিলিং এবং কালিম্পং-এর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ধসপ্রবণ এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করে সেখানে ‘রিয়েল টাইম’ বা নিখুঁত সময়ে ভূমিধসের পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থাকে একেবারে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উন্নত প্রযুক্তির তিন স্তরের সুরক্ষা বলয়
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুধু ধস নেমে যাওয়ার পর উদ্ধারকাজ চালানো নয়, বরং ধস নামার আগেই সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দেওয়া। এই উদ্দেশ্যে তিনটি স্তরে কাজ করা হবে—জিএসআই-এর উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা, পাহাড়ে ওয়েদার স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বয়ংক্রিয় মোবাইল অ্যালার্ম ব্যবস্থা।
বৃষ্টিপাতের সঠিক পরিমাণ, মাটির আর্দ্রতা এবং নির্দিষ্ট এলাকার নিখুঁত আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিপদের আগাম আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করা হবে। এই পূর্বাভাস প্রক্রিয়াকে আরও ত্রুটিহীন করতে পাহাড়জুড়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা ওয়েদার স্টেশনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এই কেন্দ্রগুলি থেকে সংগৃহীত স্থানীয় আবহাওয়া সংক্রান্ত ডেটা সরাসরি আগাম সতর্কবার্তা পাঠানোর কাজে ব্যবহার করা হবে।
মোবাইলেই বাজবে সাইরেন, বাঁচবে প্রাণ
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এই প্রকল্পের আধুনিক সতর্কতা পাঠানোর মাধ্যম। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হলে সেই অঞ্চলের কয়েক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা সমস্ত মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অ্যালার্ম বা সাইরেন বেজে উঠবে। শুধু তাই নয়, মোবাইলের স্ক্রিনেই ভেসে উঠবে কোথায় ঠিক বিপদের আশঙ্কা রয়েছে এবং সেই মুহূর্তে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের ঠিক কী করণীয়, তার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা। প্রশাসন লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, ধস নামার অন্তত ১৫ মিনিট থেকে আধ ঘণ্টা আগেই যাতে এই সতর্কবার্তা দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের হাতে পৌঁছে যায়। স্থানীয় মানুষ ছাড়াও পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরাও যাতে এই অ্যালার্ট পান, সেই বিশেষ ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
পুরনো ডেটা ও নির্মাণের রমরমা রোধে কড়া নজর
বর্তমান আবহাওয়ার খবরের পাশাপাশি কোন এলাকায় অতীতে কতবার এবং ঠিক কী কারণে ধস নেমেছিল, সেই ঐতিহাসিক তথ্যগুলিও খুঁটিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই পুরনো তথ্যের সঙ্গে বর্তমান বৃষ্টিপাত ও মাটির বর্তমান স্থিতাবস্থা মিলিয়ে প্রতিটি ধসপ্রবণ এলাকার আসল ঝুঁকি নির্ধারণ করা হবে। সম্প্রতি পাহাড় জুড়ে যেভাবে দেদার বাড়ি, হোটেল ও অন্যান্য কংক্রিটের নির্মাণ বেড়ে চলেছে এবং পাহাড়ি ঢাল কেটে বাড়ি তৈরির প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তাতে ভূমিধসের ঝুঁকি যে মারাত্মকভাবে বেড়েছে, সে বিষয়েও সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রয়েছে প্রশাসন।
কেবল আগাম সতর্কতা নয়, কোনো কারণে ধস নেমে গেলে যাতে দ্রুত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালানো যায়, তার জন্য পাহাড়ের বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামোকে আরও চাঙ্গা করা এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে রাজ্যের। আগামী এক বছরের মধ্যেই এই সম্পূর্ণ মেগা প্রকল্পটি বাস্তবে রূপায়ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে নবান্ন।