বিদেশের মাটিতে বসে এমন কী বললেন মোহন ভাগবত? আরএসএসের শতবর্ষে লণ্ডন থেকে এল বিশ্ববাসীর জন্য বড় বার্তা!

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তাদের শতবর্ষে দেশের গণ্ডি পার করে পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বের দরবারে। লন্ডনে বসে শুধু দেশবাসী নয়, বিশ্ববাসীকে একতার পাঠ দিলেন আরএসএসের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ ও সমাজের মধ্যে নানা ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে। তবে যা মানুষকে এক করে, তার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাহলে সমাজ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং পৃথিবীও আরও ভালো জায়গায় পরিণত হবে।”
‘Celebration of Oneness’ নামে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে আরএসএস-এর ১০০ বছরের যাত্রা, হিন্দু সভ্যতা, সেবা, যুবসমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। অনুষ্ঠানে নেপালে বন্যায় মৃতদের স্মরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া নেপালের ত্রাণের জন্য সেবা ইউকে (Sewa UK)-এর মাধ্যমে ১ লক্ষ পাউন্ড অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
হিন্দুরা বিশ্বকে ভারসাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে
আরএসএস-এর ১০০ বছরের যাত্রায় কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে মোহন ভাগবত জানান, ‘আপনাপন’, অর্থাৎ সবার প্রতি শুদ্ধ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই সংঘের অন্যতম মূল ভাবনা। তাঁর বক্তব্য, “একজন ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায় এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি ভালোবাসা হিন্দুদের ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। হিন্দুরা বিশ্বকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।”
সেবামূলক কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বয়ংসেবকরা কাজ করছেন। লাদাখ থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত তাঁদের কাজ বিস্তৃত। রাজনৈতিক কারণে যারা আরএসএসের বিরোধিতা করেন, তাঁরাও সংগঠনের কাজ এবং স্বয়ংসেবকদের গুণের কথা স্বীকার করেন বলে দাবি করেন তিনি। প্রয়োজনের সময়ে তাঁরাও সংঘের সহযোগিতা চান এবং আলোচনা করেন।
আগামী ১০০ বছরে কী করবে RSS?
আগামী শতবর্ষের লক্ষ্য নিয়ে আরএসএস প্রধান জানান, গত ১০০ বছরে যে কাজ শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনেও চালিয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যেই তিন প্রজন্ম সংঘের কাজে যুক্ত রয়েছে এবং আরও দুই প্রজন্ম সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সপ্তম প্রজন্মের আগেই হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করার কাজ সম্পূর্ণ হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
হিন্দু সভ্যতার বার্তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, হিন্দু চিন্তার মূল ভিত্তি হল অস্তিত্ব আসলে এক, যদিও তা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। বৈচিত্র্য মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তাই বৈচিত্র্যকে গ্রহণ এবং সম্মান করতে হবে। হিন্দু কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের নাম নয়, বরং এটি একটি মানসিকতা ও প্রকৃতি। ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ও ‘হিন্দুত্ব’ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, বিভিন্ন দর্শন ও আচার-অনুষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও একাধিক ধর্ম বৃহত্তর হিন্দু সভ্যতার কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের উপর আস্থা এবং কর্মভূমির প্রতি দায়িত্ব
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকার প্রশংসা করে মোহন ভাগবত জানান, তরুণদের মধ্যে পৃথিবীকে ভালো করে তোলার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। প্রবীণদের উচিত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের জ্ঞান দেওয়া, কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্ত তাঁদের উপর চাপিয়ে না দেওয়া। সেবা প্রসঙ্গে তাঁর বার্তা, সেবা কখনও নিজের কৃতিত্ব দেখানোর বিষয় নয়, বরং এটি ঈশ্বরের আরও কাছে যাওয়ার সুযোগ।
ব্রিটেনে বসবাসকারী হিন্দুরা যখন ভারতের কথা বলেন, তখন তাঁদের আনুগত্য নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, তারও স্পষ্ট জবাব দেন আরএসএস প্রধান। তাঁর মতে, ব্রিটেন এবং ভারতের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে কোনও সংঘাত থাকা উচিত নয়। তবে কখনও যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে যে দেশে মানুষ বসবাস করছেন, সেই দেশের প্রতিই তাঁদের প্রধান দায়িত্ব ও আনুগত্য থাকা উচিত। জন্মভূমি বা পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে পাওয়া মূল্যবোধ কর্মভূমিতে প্রয়োগ করাই প্রকৃত কর্তব্য।
লন্ডনের এই অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞ মমতা সুব্রাহ্মণ্যম। হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এই মেগা অনুষ্ঠানে হাউস অফ লর্ডসের সদস্য, সাংসদ, মেয়র, কাউন্সিলর এবং ব্রিটেনে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার পেরিয়াসামি কুমারন ও ডেপুটি হাই কমিশনার কার্তিক পান্ডে সহ প্রায় ৬০০ জন বিশিষ্ট অতিথি উপস্থিত ছিলেন।