“সন্ধ্যায় কেন আর দেখা মেলে না জোনাকির!”-নেপথ্যে লুকিয়ে কোন ভয়ংকর সত্য

গ্রীষ্মের সন্ধ্যা নামলেই একসময় গ্রামের আঁধার ভেদ করে জ্বলে উঠত জোনাকির মিটিমিটি আলো। উঠানের ঘাসে, পুকুরপাড়ে কিংবা ধানক্ষেতের আল ধরে হঠাৎ জ্বলে ওঠা সেই ছোট্ট আলো ধরতে শিশুদের ছুটে যাওয়ার দৃশ্য ছিল চিরচেনা। অন্ধকার রাতের বুকজুড়ে জোনাকির সেই নাচ ছিল প্রকৃতির নিজস্ব আলোকসজ্জা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই দৃশ্য আর যেন চোখেই পড়ে না। বেলজিয়ামের গবেষক রাফায়েল দ্য ককের শৈশবের স্মৃতিও ঠিক এমনই ছিল। কিন্তু বহু বছর পর নিজের সেই চেনা জায়গায় ফিরে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, জোনাকিরা তো দূরে থাক, সেখানে গড়ে উঠেছে অট্টালিকা ও শিল্পকারখানা। বর্তমান সময়ে গ্রীষ্মের রাতে জোনাকি কম দেখা যাওয়ার এই ঘটনা নিছক কোনো নস্টালজিয়া নয়, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত কারণ।

জোনাকিরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

পৃথিবীজুড়ে জোনাকির প্রায় ২ হাজার ৬০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। তবে এদের বেশিরভাগ প্রজাতি সম্পর্কেই বিজ্ঞানীদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এ পর্যন্ত মাত্র ১৫০টির মতো প্রজাতির সংরক্ষণগত অবস্থা মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে, যার প্রায় ২০ শতাংশই আজ বিলুপ্তির মুখে। গবেষকদের মতে, জোনাকির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে।

  • আবাসস্থল ধ্বংস: শহর ও জনবসতি দ্রুত বাড়ার ফলে জলাভূমি, বন, ঘাসভূমি ও ঝোপঝাড়ের মতো প্রাকৃতিক এলাকাগুলি রাতারাতি বাড়িঘর, রাস্তা ও শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হচ্ছে। এর ফলে জোনাকিরা তাদের বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ হারাচ্ছে।

  • কৃত্রিম আলোর আগ্রাসন: রাস্তার বাতি, বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড এবং শহরের আলোর ঝলকানিতে রাতের আঁধার ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ জোনাকির প্রজনন ও পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য অন্ধকার রাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি আলো দিয়ে তারা সঙ্গীকে আকর্ষণ করে, যা কৃত্রিম আলোর ভিড়ে হারিয়ে যায়।

  • কীটনাশকের ব্যবহার: কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে যেমন সরাসরি জোনাকির জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই তাদের খাদ্যের উৎস হিসেবে থাকা ছোট ছোট পোড়ামাচড় বা কীটপতঙ্গের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

  • জলবায়ু পরিবর্তন: দীর্ঘস্থায়ী খরা, উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র ঝড়ঝাপ্টার মতো বৈশ্বিক সমস্যাগুলিও জোনাকির স্বাভাবিক বসতি ধ্বংস করছে।

  • অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন: থাইল্যান্ড, জাপান বা তাইওয়ানের মতো দেশগুলিতে জোনাকি দেখতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। অতিরিক্ত পর্যটক এবং মোটরবোট চলাচলের কারণে নদীর তীর ও ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফিরে পেতে হবে প্রকৃতির ভারসাম্য

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জোনাকির এই সংকট কেবল একটি মাত্র পোকার বিলুপ্তির গল্প নয়, এটি আমাদের পুরো পরিবেশ ও বদলে যাওয়া রাতেরই এক সতর্কবার্তা। জোনাকির এই জাদুকরি আলো টিকিয়ে রাখতে হলে সবার আগে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও জলাভূমি সংরক্ষণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় রাতের কৃত্রিম আলো কমানো, বাগানে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং ঝোপঝাড় বা শুকনো পাতা দ্রুত পরিষ্কার না করার মতো ছোট ছোট উদ্যোগই পারে জোনাকিদের ফিরিয়ে আনতে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের (আইইউসিএন) ফায়ারফ্লাই স্পেশালিস্ট গ্রুপসহ বিশ্বের গবেষকরা এই বিষয়ে নানাবিধ উদ্যোগ নিলেও, সাধারণ মানুষের সচেতনতা ছাড়া এই মহাযজ্ঞ সফল হওয়া অসম্ভব।

আজ কোনো গ্রামে বা শহরের প্রান্তে হঠাৎ দু-একটি জোনাকি উড়তে দেখলে তা নিছক সুন্দর দৃশ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র আলোই মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের চারপাশের পরিবেশ এখনও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। প্রকৃতিকে একটু সুযোগ দিলে এবং রাতের সেই আদিম অন্ধকার ফিরিয়ে আনতে পারলে হয়তো একদিন গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় ঘাসের ওপর আবার শত শত জোনাকির আলো জ্বলে উঠবে, আর শিশুরা ফের মেতে উঠবে তাদের পিছু নেওয়ার আনন্দে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *