ওজন কমাতে কোনটি বেশি কার্যকরী—গ্রিন টি নাকি ব্ল্যাক কফি? গবেষণায় যা উঠে এল জানলে চমকে যাবেন

ওজন কমানোর লড়াইয়ে নামলে প্রতিদিন সকালে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—দিনের শুরুটা কি এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে হওয়া উচিত, নাকি গ্রিন টি দিয়ে? চিনি, দুধ বা ক্রিম ছাড়া পান করলে এই দুই পানীয়তেই ক্যালোরির পরিমাণ থাকে অত্যন্ত কম। পাশাপাশি দুটিতেই রয়েছে ক্যাফেইন ও উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান, যা মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, এর মধ্যে ঠিক কোনটি দ্রুত ওজন কমাতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে?
ভুবনেশ্বরের মণিপাল হসপিটালের এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. যতীন কুমার মাঝির মতে, বর্তমান চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী গ্রিন টি সামান্য হলেও কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। তবে এই সুবিধাটি খুবই সামান্য এবং একে কোনোভাবেই রাতারাতি ওজন কমানোর জাদুকরী উপায় হিসেবে ভেবে নেওয়া ভুল হবে।
গবেষণা কী বলছে?
প্রাপ্তবয়স্ক ১,৭১০ জনের ওপর পরিচালিত মোট ২২টি গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্লাসিবো বা সাধারণ জলের তুলনায় গ্রিন টি সেবনের সঙ্গে ওজনের সামান্য হ্রাসের একটি যোগসূত্র রয়েছে। তবে গবেষকরা এই তথ্যের নিশ্চিতকরণকে নিম্ন থেকে অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া বেশিরভাগ গবেষণার সময়কালই ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত, যার গড় মেয়াদ ছিল মাত্র ১০ সপ্তাহের কাছাকাছি। অন্যদিকে, ওই একই বিশ্লেষণে ব্ল্যাক কফির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো ওজন কমানোর প্রভাব দেখা যায়নি।
অন্য আরেকটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গ্রিন টি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে শরীরের ওজন, বিএমআই (BMI), কোমর ও শরীরের চর্বির শতকরা হারে সামান্য হলেও ঘাটতি দেখা দেয়। তবে এখানেও প্রভাবের মাত্রাটি বেশ কম। ডা. মাঝির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রিন টি-তে ক্যাফেইনের পাশাপাশি ক্যাটেচিন বিশেষ করে ইজিসিজি (EGCG) থাকায় এটি কিছুটা সুবিধা দেয়। কিন্তু তাই বলে গ্রিন টি-কে একা কোনো ওজন কমানোর চিকিৎসা হিসেবে দেখলে চলবে না।
গ্রিন টি কেন সামান্য এগিয়ে?
গ্রিন টি-তে প্রাকৃতিকভাবে ক্যাটেচিন এবং ক্যাফেইন উভয় উপাদানই একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। গবেষকদের মতে, এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণ শরীরের ওজন এবং ফ্যাট মেটাবলিজমের ওপর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ‘ফ্যাট-বার্নিং’ বা চর্বি গলানোর মতো শব্দগুলো শুনলে যতটা জাদুকরী মনে হয়, বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রভাব অতটা বড় নয়। গ্রিন টি দীর্ঘমেয়াদে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে বটে, তবে এটি একা কখনোই বড় ধরনের ওজন হ্রাসের কারণ হতে পারে না।
ব্ল্যাক কফির কার্যকারিতা কেমন?
গ্রিন টি-র তুলনায় ব্ল্যাক কফিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ অনেকটাই বেশি থাকে। সাধারণত এক কাপ বা ৮ আউন্স ব্রুড কফিতে প্রায় ৯৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে, যেখানে সমপরিমাণ গ্রিন টি-তে থাকে মোটে ২৮ মিলিগ্রামের মতো। ক্যাফেইন সাময়িকভাবে শারীরিক সজাগতা বৃদ্ধি করে এবং শক্তি খরচ ও ফ্যাট অক্সিডেশনে প্রভাব ফেলে। যারা নিয়মিত এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য ক্যাফেইন শারীরিক সহনশীলতা ও পেশির কার্যকারিতা বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে।
ডা. মাঝির মতে, ব্ল্যাক কফিতে ক্যাফেইনের মাত্রা বেশি থাকায় যারা এটি ভালো সহ্য করতে পারেন, তাঁরা ব্যায়ামের আগে এটি পান করলে বেশি উপকার পেতে পারেন। তবে এখানে মূল লাভটি আসে শরীর চাঙ্গা হওয়া এবং ব্যায়ামের পারফরম্যান্স ভালো হওয়ার দিক থেকে, সরাসরি ওজন কমার ক্ষেত্রে কফির ভূমিকা খুব বেশি নয়। এছাড়া অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যকারিতাও কমতে শুরু করে।
ওজন কমার আসল বাধা লুকিয়ে কাপের ভেতরেই
আপনি চা বা কফি যাই বেছে নিন না কেন, তার আসল ক্যালোরি নির্ভর করে তাতে আপনি কী মেশাচ্ছেন তার ওপর। কাপ ভর্তি চিনি, ক্রিম, ফ্লেভারড সিরাপ বা কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে ফেললে যেকোনো সাধারণ পানীয়ই ক্যালোরির অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হয়। তাই প্লেইন ব্ল্যাক কফি বা চিনি ছাড়া গ্রিন টি ওজন কমাতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
কতখানি ক্যাফেইন ক্ষতিকর?
বেশিরভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করা নিরাপদ বলে মনে করে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (USFDA)। তবে ক্যাফেইনের প্রতি মানুষের সহ্যক্ষমতা আলাদা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এর চেয়ে কম পরিমাণেও উদ্বেগ, বুক ধড়ফড় করা বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঘুমানোর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান তথ্যের বিচারে গ্রিন টি সামান্য এগিয়ে থাকলেও এর মধ্যে কোনোটিকেই জাদুকরী উপায় বলা চলে না। দীর্ঘস্থায়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওজন কমাতে চাইলে সবার আগে সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া উচিত।