ব্রেন স্ট্রোকের রোগীকে বাঁচাতে চরম দেরি! হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকের মৃত্যুর মামলায় বিরাট রায় উপভোক্তা কমিশনের

জরুরি চিকিৎসার মুহূর্তে নিয়মকানুনের মারপ্যাঁচ কেড়ে নিল একটি তরতাজা প্রাণ। চিকিৎসায় চরম গাফিলতির অভিযোগে এবার এক বড় রায় দিল উপভোক্তা কমিশন। ব্রেন স্ট্রোকের শিকার হওয়া এক তরুণ পিএইচডি গবেষকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে যৌথভাবে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২০ সালে, আর দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ছয় বছর পর এল এই রায়।

মৃত যুবকের নাম সূর্য প্রতাপ। উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা সূর্য হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের পিএইচডি গবেষক ছিলেন। ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলের করিডরে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। দ্রুত তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে গাচিবৌলির সিটিজেন্স স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, তাঁর মস্তিষ্কে গুরুতর স্ট্রোক হয়েছে এবং রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। রোগীর জীবন বাঁচাতে অবিলম্বে মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি করা প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু অভিযোগ ওঠে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করার পরিবর্তে নানা নিয়মকানুনের অজুহাতে বহুমূল্য সময় নষ্ট করা হয়। সেই সময় করোনা মহামারী চলার কারণে সূর্যের কোভিড পরীক্ষা করানো হয় এবং রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত তাঁকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে আটকে রাখা হয়। অথচ জরুরি পরিস্থিতিতে কোভিড রিপোর্টের জন্য জীবনদায়ী চিকিৎসা আটকে রাখা যায় না, এমন সরকারি নির্দেশিকা থাকলেও তা মানা হয়নি। পাশাপাশি, রোগীর বাবা-মা হাসপাতালে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের লিখিত সম্মতির জন্য অপেক্ষা করার অজুহাতেও চিকিৎসায় দেরি করা হয়। অথচ তাঁর সহপাঠীরা চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করতে প্রস্তুত ছিলেন।

প্রক্রিয়াগত এই দীর্ঘসূত্রিতায় সূর্যের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। তাঁকে ভেন্টিলেটরে রাখতে হয় এবং পরে কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ওই বছরের ২১ আগস্ট মাত্র ৩০ বছর বয়সে ব্রেন-ডেড হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর পর ন্যায়বিচার চেয়ে হায়দরাবাদ জেলা উপভোক্তা কমিশনের দ্বারস্থ হন সূর্যের বাবা-মা। দীর্ঘ শুনানি ও সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর কমিশন সিটিজেন্স স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল এবং নিউরোলজিস্ট ডা. অপর্ণা বিজয়কুমারকে চিকিৎসায় গাফিলতির জন্য দোষী সাব্যস্ত করে। রায়ে বলা হয়েছে, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে মৃতের পরিবারকে যৌথভাবে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে অতিরিক্ত সুদ দিতে হবে। তবে অপর অভিযুক্ত কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়ম বা হাসপাতালের প্রটোকল কতটা প্রাধান্য পাওয়া উচিত, তা নিয়ে এই রায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, জীবন বাঁচানোই যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য, সেখানে নিয়মকানুনের চক্করে পড়ে রোগীর মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *