পোড়া খাবারেই লুকিয়ে মৃত্যুর ফাঁদ! মা-ঠাকুমার বারণকে কুসংস্কার ভাবছেন? জানুন চমকে দেওয়া বৈজ্ঞানিক সত্য

পোড়া খাবার অনেকের কাছেই অত্যন্ত সুস্বাদু হলেও অতিরিক্ত পোড়া বা কড়া ভাজা খাবার নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মা-ঠাকুমারা অতীতে পোড়া খাবার খেতে বারণ করলে অনেকেই তাকে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিতেন। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণায় পরিষ্কার প্রমাণিত হয়েছে যে প্রবীণদের সেই সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে এক কঠিন ও বাস্তব বৈজ্ঞানিক সত্য।
অ্যাক্রিলামাইডের মারাত্মক ঝুঁকি ও ক্যানসারের আশঙ্কা
ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটির তথ্য অনুসারে, অতিরিক্ত ভাজা বা পোড়া খাবারে তৈরি হওয়া ‘অ্যাক্রিলামাইড’ নামক রাসায়নিক উপাদান মানুষের শরীরে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষণাগারে প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে এই উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে সরাসরি কোষের ক্ষতি করে টিউমার তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের শরীরের ওজন কম থাকায় এই রাসায়নিকের বিষাক্ত প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পড়ে।
নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিচ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন যে নিয়মিত অতিরিক্ত পোড়া খাবার খেলে নারীদের ক্ষেত্রে ওভারিয়ান ও এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের আশঙ্কা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এই রাসায়নিক মানবদেহের হরমোনের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত অ্যাক্রিলামাইডের সঙ্গে কিডনি ক্যানসারেরও সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি ও গর্ভস্থ সন্তানের ঝুঁকি
ক্যানসারের আশঙ্কার বাইরেও এই রাসায়নিক উপাদান মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি রক্তে মিশে দীর্ঘমেয়াদে নার্ভ কোষের প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন নষ্ট করে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রতিদিন অল্প অল্প করে এই বিষাক্ত উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে বয়সকালে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের মতো জটিল স্নায়ুরোগ দেখা দিতে পারে।
পাশাপাশি, চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ সন্তানের জন্য পোড়া খাবার খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। জলের সঙ্গে সহজেই মিশে যাওয়ার ক্ষমতার কারণে অ্যাক্রিলামাইড মায়ের শরীর থেকে সরাসরি গর্ভের শিশুর রক্তে পৌঁছে যেতে পারে। এর ফলে গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং জন্মের সময় শিশুর ওজন ও মাথার আকার স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সুরক্ষার সহজ উপায় ও রান্নার সঠিক পদ্ধতি
এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রিয় খাবার খাওয়া একেবারে বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, কেবল রান্নার পদ্ধতিতে কিছুটা সচেতন পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আলু ভাজার বা চিপস তৈরির আগে খোসা ছাড়ানো কাঁচা আলুর টুকরো অন্তত ১০ মিনিট হালকা গরম জলে ভিজিয়ে রাখা উচিত। এই সামান্য অভ্যাসের ফলেই রান্নার সময় ক্ষতিকর অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হওয়ার পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
যেকোনও খাবার রান্না বা সেঁকার সময় অতিরিক্ত কড়া আঁচে না পুড়িয়ে হালকা আঁচে সোনালি বা হালকা বাদামি করে ভেজে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। এছাড়া ব্রেকফাস্টে পাউরুটি বা টোস্ট অসাবধানতায় বেশি পুড়ে গেলে খাওয়ার আগে অবশ্যই ছুরির সাহায্যে পোড়া কালো অংশটি কেটে বাদ দেওয়া উচিত। রান্নায় সামান্য সচেতনতা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস আপনার পুরো পরিবারকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নিরাপদে রাখতে পারে।