জনসংখ্যার লভ্যাংশ নাকি বিরাট টাইম বোমা? ২৩ শতাংশ জেন জির হাতে কাজ নেই, পড়াশোনাও নেই! এ কোন গভীর সঙ্কটের মুখে ভারত?

ভারতের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ প্রজন্ম বা জেন জি (Gen Z)। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি এই তরুণ-তরুণীরাই আগামী দিনের দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি। বর্তমানে প্রায় ৩৭ কোটি এই জেন জি জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় যুবশক্তিকে ঘিরেই এবার এক চরম উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল, যা দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
নীতি আয়োগের চাঞ্চল্যকর তথ্য:
নীতি আয়োগের প্রকাশিত ‘Reimagining Skilling for Viksit Bharat@2047’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশের তরুণ সমাজকে নিয়ে এক ভয়ানক চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্ট বলছে, দেশের বর্তমান জেন জি জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ বা প্রায় ৮ কোটি ৭০ লক্ষ তরুণ-তরুণী বর্তমানে ‘NEET’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, এই বিপুল সংখ্যক যুবসমাজের না রয়েছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, না আছে কোনো কর্মসংস্থান, কিংবা কাজ পাওয়ার মতো কোনো প্রয়োজনীয় পেশাগত প্রশিক্ষণ বা স্কিল।
সঙ্কটের নেপথ্যে কোন কারণগুলি?
-
লিঙ্গ বৈষম্য: NEET-এর এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মধ্যে তরুণীদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি। বহু পরিবারে মেয়েদের পড়াশোনা বা কেরিয়ারের সুযোগ না দিয়ে ঘরের কাজে আটকে রাখা হয়, যা স্পষ্ট এক লিঙ্গ বৈষম্যের ছবি তুলে ধরে।
-
অর্থনৈতিক বাধা ও উচ্চশিক্ষার খরচ: দেশের সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের কাছে উচ্চশিক্ষা বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্সের খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন। টিউশন ফি, বইপত্র বা যাতায়াতের খরচ জোগাতে গিয়ে বহু পরিবার হিমশিম খায়, যার জেরে পড়াশোনা মাঝপথেই থামিয়ে দিতে বাধ্য হয় তরুণেরা।
-
চাকরির বাজারে মন্দা ও এআই-এর প্রভাব: প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন মুখ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু সরকারি চাকরির দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশ্নফাঁস বা দুর্নীতির মতো সমস্যা যেমন অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, তেমনই বেসরকারি ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অনুকূল নয়। গত কয়েক বছরে তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ক্ষেত্রে ফ্রেশারদের নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অটোমেশনের দাপটে চাকরির সুযোগ আরও সংকুচিত হচ্ছে।
-
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ার ফারাক: প্রচলিত স্কুল বা কলেজ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্পোরেট বা কাজের জায়গার চাহিদার আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, কলেজ পাশ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৮ শতাংশ তাঁদের পঠিত বিষয় নিয়ে চাকরি পান।
ভারতের এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে কেবল নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই চলবে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যবর্তী কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করে স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।