নেপালের ধ্বংসলীলা এবার বাংলাতেও? সিকিম-দার্জিলিং নিয়ে বিশেষজ্ঞদের যে সতর্কবাণী

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান এবং তিব্বত সীমান্ত জুড়ে চলা প্রাকৃতিক তাণ্ডব গোটা উপমহাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। চোখের পলকে আস্ত গ্রাম, রাস্তাঘাট ও সেতু ভেসে যাওয়ার এই হৃদয়বিদারক ছবি দেখার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— তবে কি এ বার একই ধরনের বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের সংবেদনশীল হিমালয় অঞ্চলও? বিশেষ করে বাঙালির প্রিয় ভ্রমণস্থল দার্জিলিং, কালিম্পং এবং সংলগ্ন সিকিমের ভূপ্রকৃতি যেভাবে বেলাগাম পরিকাঠামো ও নির্মাণের জেরে বদলাচ্ছে, তাতে বড়সড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন গবেষক ও পরিবেশবিদরা।

নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক তথা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের কোঅর্ডিনেটর গুপিনাথ ভাণ্ডারী সরাসরি সতর্ক করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দার্জিলিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি যে কোনও মুহূর্তে জোশিমঠের ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত বহুতল হোটেল এবং বড় বড় কনস্ট্রাকশনের ওজন এই ভঙ্গুর মাটি সহ্য করতে পারে না, যা ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি, লাগাতার বা দীর্ঘ সময় ধরে চলা হালকা বৃষ্টির জল মাটির ভেতরে চুঁইয়ে গিয়ে ভেতরের চাপ বাড়িয়ে দেয়, যা ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মত তাঁর।

একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের সহকারী অধ্যাপক ড. সৌমিতা ব্যানার্জী। তাঁর মতে, সিকিমে চারশোটির বেশি হ্রদ রয়েছে এবং এখানকার ভূমির ঢাল অনেক বেশি হওয়ায় জল মারাত্মক গতিতে নিচে নেমে আসতে পারে। এর ওপর যত্রতত্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ এবং পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর হিড়িক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF)-এর মতো ঘটনা এখন আর আগের মতো সময়মতো পূর্বাভাস দিয়ে আসে না। দার্জিলিং আবার ‘ক্যাসকেডিং জোন’-এ থাকায় সিকিম থেকে তিস্তার জলের প্রভাব সরাসরি এখানে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির সঙ্গে লাগাতার লড়ে পাহাড় কেটে ভারী নির্মাণ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য যেভাবে বিঘ্নিত করা হচ্ছে, তা আদতে ডেকে আনছে সনাশ। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সংবেদনশীলতা বুঝে পরিকল্পনা করা। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের নীতিকে গুরুত্ব না দিলে নেপালের মতো বিপর্যয় যে কোনও দিন বাংলার পাহাড়েও আছড়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *