‘মরণোত্তর দেহদানে লাভ নেই!’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিস্ফোরক মন্তব্যে তুলকালাম চিকিৎসকমহল

মরণোত্তর দেহদান নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, মরণোত্তর দেহদানের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেহও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো কাজে লাগেনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরেই রাজ্যের চিকিৎসক এবং দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা তীব্র বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, দেহদান করে বিশেষ কোনো লাভ হয় না। বাঙালিরা অনেক সময় উৎসাহের বশে পুরো শরীরটাই দান করে দেন, যা না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখে এহেন কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই অবাক হয়েছেন অনেকে।
চিকিৎসক মহলের প্রতিক্রিয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন অ্যানাটমির প্রবীণ চিকিৎসক ডা: শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্পষ্ট কথা, ক্যাডাভার বা মৃতদেহ ছাড়া অ্যানাটমির শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণ হতে পারে না। মেডিক্যাল পড়ুয়াদের ডিসেকশন থেকে শুরু করে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা কিংবা বিভিন্ন সার্জিক্যাল ওয়ার্কশপে মৃতদেহের অপরিহার্য প্রয়োজন রয়েছে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে অঙ্গদান কেবল আইসিইউ-তে মৃত্যু হওয়া বা ব্রেন ডেথ ঘোষণা করা দেহ থেকেই সম্ভব।
অর্থোপেডিক চিকিৎসক ডা: উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে জানিয়েছেন, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের বর্তমান পাঠ্যক্রমে শব ব্যবচ্ছেদ একটি অত্যন্ত আবশ্যিক অঙ্গ। কৃত্রিম কোনো সিমুলেটর বা থ্রি-ডি মডেল কখনোই বাস্তব শব ব্যবচ্ছেদের বিকল্প হতে পারে না।
অন্যদিকে, এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন দেহদান আন্দোলনের পরিচিত মুখ তথা ‘গণদর্পণ’ সংগঠনের সম্পাদক সুদীপ্ত সাহা রায়। তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, উন্নত বিশ্বেও ক্যাডাভার ডিসেকশনের মাধ্যমেই চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা করা হয়। সেখানে একজন চিকিৎসক হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এমন কথা কেন বললেন, তা বোধগম্য নয়।
জ্যোতি বসুর দেহ নিয়ে বিতর্ক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেহদান প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি ছিল যে সেই দেহ কোনো কাজেই লাগেনি। এই বক্তব্যেরও কড়া জবাব দিয়েছেন সুদীপ্তবাবু। তিনি পাল্টা দাবি করে জানিয়েছেন, ১৭ বছর বাদে এসে এই ধরনের দাবি সম্পূর্ণ ভুল। এসএসকেএম হাসপাতালের অ্যানাটমি বিভাগে জ্যোতি বসুর দেহের ডিসেকশন হয়েছে এবং ছাত্রছাত্রীরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে তাতে অংশগ্রহণ ও গবেষণা করেছেন।
তবে এই বিতর্কের মাঝেও কিছুটা ভারসাম্যের সুর শোনা গেছে বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: অরিন্দম বিশ্বাসের গলায়। তিনি মনে করেন, বিদেশে কৃত্রিম বা থ্রি-ডি মডেল দিয়ে অ্যানাটমি পড়ানোর চল থাকলেও, ভারতের মতো দেশে পরিকাঠামো এবং খরচের কথা বিবেচনা করলে এই পদ্ধতি পুরোপুরি চালু হতে এখনও অনেক সময় লাগবে। সব মিলিয়ে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য চিকিৎসকমহলে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে।