বাংলাদেশে কনসার্ট, নৌকাবাইচ ও ওরস বন্ধের হিড়িক! নেপথ্যে কি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কনসার্ট, ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও ওরস আয়োজনে বাধা দেওয়ার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। একটি মহল প্রশাসনের কাছে এসব আয়োজন বন্ধের লিখিত আবেদন জানাচ্ছে, কোথাও আবার হামলার ঘটনাও ঘটছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার কর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিল্পীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কী কী ঘটনা ঘটেছে?

  • ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলা: গত ১৮ আগস্ট রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে মাদকবিরোধী সমাবেশ উপলক্ষে আয়োজিত এক গানের অনুষ্ঠানে হামলা চালায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। উচ্চস্বরে গানবাজনার অভিযোগ তুলে তারা অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। এই ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ করা হয়।

  • কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিল: ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে কয়েকটি ব্যান্ড গ্রুপের যৌথ কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘ইমাম-উলামা পরিষদ’-এর লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসন ওই কনসার্ট বাতিল করে দেয়।

  • নৌকাবাইচে শর্ত ও ওরসে বাধা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী এবং সিলেটের সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তুলেছিল একটি গোষ্ঠী। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত নৌকাবাইচের অনুমতি দিলেও ‘সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে নাচানাচি’ না করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, সাভারে ওরস বাতিলেরও দাবি জানানো হয়েছিল, যেখানে প্রশাসন পুলিশি নিরাপত্তার পাশাপাশি উচ্চৈস্বরে গান বাজানো নিষেধ করেছে।

কী বলছেন শিল্পীরা? জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর এই ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশ একটি হাজার বছরের কৃষ্টির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু এখন যে অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হচ্ছে, সেখানে সরকারের ভূমিকা কী? যদি গান-বাজনা বন্ধই করে দিতে হয়, তবে সরকার পরিষ্কার করে বলুক।” তিনি আরও যোগ করেন, “সংবিধানের কোথায় লেখা আছে বাংলাদেশে গান-বাজনা করা যাবে না?”

সুফী সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ: বিশ্ব সুফী সংস্থার মুখপাত্র আফত্বা আহমেদ জিলানী জানিয়েছেন, গত কয়েকমাস ধরে নানা অজুহাতে অনেক মাজারে ওরস আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও গান-বাজনা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খানও এই ঘটনাগুলোকে একটি ‘দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ’ বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, “নতুন সরকার আসায় একটি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।”

প্রশাসনের বক্তব্য: তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ জানিয়েছেন, কনসার্ট বাতিল হওয়ার পেছনে নিরাপত্তাজনিত কারণ থাকতে পারে। এটিকে সরকারের অসহযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে, পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “স্থানীয়ভাবে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তবে কারো ব্যক্তিগত মতবাদ জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উগ্রবাদ, যা আমরা হতে দেব না।”

সব মিলিয়ে দেশের লোকজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই বাধা-বিপত্তির ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *