বিদেশি জাহাজের রাজত্ব শেষ? দেশের বাণিজ্য সুরক্ষিত করতে বড় রোডম্যাপ ঘোষণা করল ন্যাশনাল শিপিং বোর্ড

ভারতের নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজ বহরকে আরও শক্তিশালী করতে এবং বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এক বিরাট ও দূরদর্শী রোডম্যাপ তৈরি করল ন্যাশনাল শিপিং বোর্ড (NSB)। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতের বিদেশ-নির্ভর বাণিজ্যিক জাহাজ বহরে আরও ১০০টি নতুন জাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি দিল্লির সিভিল সার্ভিসেস অফিসার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত ন্যাশনাল শিপিং বোর্ডের প্রথম ‘সাগর সংবাদ’ অনুষ্ঠানে এই বড় ঘোষণা করা হয়।
‘মেরিটাইম ইন্ডিয়া ভিশন ২০৩০’ এবং ‘মেরিটাইম অমৃত কাল ভিশন ২০৪৭’-এর রোডম্যাপ সামনে রেখে আয়োজিত এই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ পরিবহণ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য, বন্দর, জাহাজ পরিবহণ ও জলপথ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর-সহ মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিক, দেশের বিশিষ্ট জাহাজ মালিক, শিল্পপতি ও আর্থিক সংস্থার প্রতিনিধিরা।
কেন এই বড় সিদ্ধান্ত?
বর্তমানে জ্বালানি তেল, গ্যাস, কয়লা এবং ইউরিয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহণের জন্য ভারতকে বিপুল পরিমাণে বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত প্রতি বছর প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশি শিপিং সংস্থাগুলিকে ফ্রেট বা ভাড়া বাবদ পরিশোধ করে। এই বিশাল আর্থিক লেনদেন এবং পরিকাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে দেশের জলপথের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে কেন্দ্র।
অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর স্পষ্ট জানান যে, এটি ভারতীয় জাহাজ মালিকদের দক্ষতার অভাব নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক খরচ এবং পর্যাপ্ত কার্গো নিশ্চিত করার বিষয়। বর্তমানে বিদেশি পতাকার তুলনায় ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ পরিচালনা করতে প্রায় ১৬ থেকে ২০ শতাংশ বেশি খরচ হয়। আমদানি শুল্ক, করের বোঝা এবং ঋণের চড়া সুদের কারণে ভারতীয় মালিকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। এই সমস্যা সমাধানে আর্থিক সংস্কার এবং ব্যবসা সহজ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ দফার বিশেষ রোডম্যাপ
ন্যাশনাল শিপিং বোর্ডের বৈঠকে বাণিজ্য ও পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য পাঁচ দফা রূপরেখা পেশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
আর্থিক সংস্কার ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা।
দেশীয় জাহাজের জন্য নিশ্চিত কার্গো বা পণ্যের জোগান।
নিয়মকানুন সরলীকরণ এবং ব্যবসার পরিবেশ আরও অনুকূল করা।
কর্মসংস্থান ও দেশীয় উৎপাদনের ওপর জোর
অনুষ্ঠানে ভারতের দক্ষ সমুদ্রকর্মী বা ‘সিফেয়ারার’দের ভবিষ্যৎ এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য জানান, মেরিটাইম সেক্টর ভারতের যুব সমাজের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ক্রুজ শিপিং এবং আধুনিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, দেশের মাটিতে কনটেনার উৎপাদনের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার ‘কনটেনার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসিস্ট্যান্স স্কিম’ অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানান সর্বানন্দ সোনোয়াল। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা ‘মারস্ক’ (Maersk) ভারতে তৈরি কনটেনার অর্ডারের জন্যও এগিয়ে এসেছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশের বন্দরগুলির ক্ষমতা বছরে ১০ হাজার মিলিয়ন টনে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তার সুফল দেশের শিল্পপতি ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই বোর্ডের মূল উদ্দেশ্য।