“২০২৬ সালেই শেষ হচ্ছে মেয়াদ!”-ফরাক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও বিহারের দ্বন্দ্বে চরম চাপে কেন্দ্র

শুনতে আশ্চর্য ও চমকপ্রদ লাগলেও এটি একশো শতাংশ সত্যি যে, আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশ মাছ সাঁতরে সুদূর এলাহাবাদের সঙ্গম পর্যন্ত পৌঁছে যেত। সরকারি কাগজপত্রেও সেই জাদুকরী সময়ের নজির রয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে গঙ্গার ওপর ফরাক্কা বাঁধ বা ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরি হওয়ার পর ইলিশের সেই উজানের যাত্রা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৬-১৮ কিলোমিটার দূরে তৈরি ২.২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০৯টি গেট বিশিষ্ট এই বাঁধ আজ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
ফরাক্কা বাঁধ কেন তৈরি হয়েছিল?
মূলত ব্রিটিশ আমল থেকেই হুগলি নদীর নাব্যতা রক্ষা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল। অতিরিক্ত পলি জমে হুগলি নদী ক্রমশ অগভীর হয়ে পড়ায় কলকাতা বন্দরে বড় বড় জাহাজ ঢোকার ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি হচ্ছিল। এই সমস্যা মেটানোর জন্যই গঙ্গার কিছু অতিরিক্ত জল হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরি হয়, যেখান থেকে ৩৮ থেকে ৪২ কিমি দীর্ঘ একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে জল ছাড়া হয় ভাগীরথী বা হুগলি নদীতে। অন্যদিকে, গঙ্গার অপর শাখাটি পদ্মা নাম নিয়ে চলে যায় বাংলাদেশে।
ফরাক্কা চুক্তি এবং বর্তমান বিতর্ক
ফরাক্কা থেকে হুগলিতে জল ছাড়ার ফলে পদ্মার জলস্তর কমতে থাকায় আপত্তি তোলে ঢাকা। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবে গৌড়া এবং শেখ হাসিনার মধ্যে ঐতিহাসিক ফরাক্কা জলবন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি সেই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে। আর ঠিক এই কারণেই বর্তমানে ফরাক্কা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি জল দাবি করছে। তাদের যুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে নদীর প্রবাহ কমেছে, তাই নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মরশুমে জল পাওয়ার ক্ষেত্রে পাকাপাকি ‘গ্যারান্টি’ বা নিশ্চয়তা চায় তারা। প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে বা রাষ্ট্রসংঘে তোলারও হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশ।
বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সংকট
এই চুক্তির নবীকরণ নিয়ে শুধু ঢাকা নয়, চরম অসন্তোষ রয়েছে ভারতের অন্দরেও। ২০১৬ সালে তৎকালীন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফরাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার দাবি তুলেছিলেন। বিহারের অভিযোগ, বর্ষাকালে ফরাক্কার কারণে গঙ্গার জল থমকে গিয়ে রাজ্যে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের সৃষ্টি করে। চলতি বছরেও পাটনা সহ একাধিক এলাকা জলমগ্ন হওয়ায় বিহারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফরাক্কার সমস্ত গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের কাছে ফরাক্কা কেবল জলবন্টনের বিষয় নয়, এটি কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের জীবনরেখা। বাংলাদেশকে বাড়তি জল দেওয়া হলে হুগলি নদীতে জলের জোগান কমবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় শঙ্কা।
২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ফরাক্কা চুক্তির মেয়াদ ফুরোচ্ছে। এমতাবস্থায়, এক দিকে বাংলাদেশের নতুন দাবি, অন্য দিকে বিহারের বন্যা পরিস্থিতি এবং পশ্চিমবঙ্গের বন্দর ও নদী বাঁচানোর লড়াই—এই ত্রিমুখী স্বার্থের সংঘাতে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন মোদীর কেন্দ্রের সামনে এক বিরাট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।