‘পূর্ব সীমান্তে আরেকটি পাকিস্তান তৈরি হচ্ছে!’ -তরেক জিয়ার সরকার নিয়ে সজীব ওয়াজেদের হুশিয়ারি

বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ফের এক চাঞ্চল্যকর ও দূরপ্রসারী ভূ-কৌশলগত আশঙ্কা প্রকাশ করলেন বিশিষ্ট ভূ-কৌশলবিদ ব্রহ্ম চেল্লানি। তাঁর জোরালো দাবি, বর্তমান বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমশ আরও বেশি ইসলামপন্থী কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যার সুদূরপ্রসারী এবং গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে চলেছে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে। সম্প্রতি পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে সম্পাদিত তথাকথিত ‘মক্কা’ বা ইসলামি ন্যাটো প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতি ঢাকা সরকারের প্রকাশ্য আগ্রহ এবং পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদির সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এই বিরাট পরিবর্তনেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।
চলতি মাসের শুরুতেই স্বাক্ষরিত ওই ইসলামি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন খোদ বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও বেশি শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকার। ভূ-কৌশলবিদ চেল্লানির মতে, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধরনের মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশের ঘটনা এই প্রথম, যা বর্তমান কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক ইতিমধ্যেই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদের আবদ্ধ করেছে। যদি বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে প্রবেশ করে, তবে কৌশলগতভাবে তারাও পাশে পেয়ে যাবে বাকি শক্তিশালী তিন দেশকে।
চেল্লানির মতে, বাংলাদেশ যদি এই চারিত্রিক জোটে সম্পৃক্ত হয়, তবে ভারতের সঙ্গে ঢাকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে বাধ্য। একই সঙ্গে বেজিংয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। গত জুন মাসে বেজিং সফরে গিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় চিনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান এবং বিশ্বস্ত অংশীদার বলে অভিহিত করেছিলেন তারেক রহমান। চেল্লানির মতে, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে এই সখ্য এবং তার পাশাপাশি চিনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার এই সামগ্রিক প্রবনতাকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপির ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক অবস্থানের পটভূমিতেই দেখা উচিত।
তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ক্ষমতাসীন এই দল দীর্ঘকাল ধরেই দেশের বিভিন্ন ইসলামপন্থী শক্তিগুলির সঙ্গে গভীর ও সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থনভিত্তি মজবুত করতে প্রায়শই ভারত-বিরোধী প্রপাগান্ডা বা বার্তা ব্যবহার করে থাকে। সেই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান বিদেশনীতি কোনো আকস্মিক বা নতুন পথ নয়, বরং এটি তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অবস্থানেরই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কৌশলগত রূপায়ন।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই নয়াদিল্লি ও ঢাকার পারস্পরিক সম্পর্কে এক গভীর টানাপোড়েন ও শীতলতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনও পর্যন্ত তিনি ভারতে তাঁর প্রথম কোনো সরকারি সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে তাঁকে দু’বার দ্বিপাক্ষিক সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হলেও, এখনও পর্যন্ত তারেক রহমানের কার্যালয় থেকে সেই বিষয়ে কোনো সাড়া মেলেনি। হাসিনার বিদায়ের পর থেকেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরের সম্পর্কও দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোচ্ছে। আর এই সামগ্রিক পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি ভারতের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলে তীব্র সতর্কবার্তা দিয়েছেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ। চলতি মাসের শুরুতেই নয়াদিল্লির একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওয়াজেদ বিস্ফোরক দাবি করেন যে, পাকিস্তানের কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-সহ বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে বর্তমানে বাংলাদেশে অবাধে কাজ করার ‘অবারিত স্বাধীনতা’ দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, তা হলো—আমাদের পূর্ব সীমান্তে ধীরে ধীরে আরেকটি পাকিস্তান মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।