৫১ বছরের পুরনো নিয়ম বদলে ‘সুপার সিএম’ দেবেন্দ্র ফড়ণবিশ! সরকারের অন্দরেই শুরু চরম তোলপাড়

মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এক বিরাট ভূকম্পন তৈরি হলো। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতা এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে নিলেন দেবেন্দ্র ফড়ণবিশ। রাজ্যের প্রশাসনিক কার্যবিধিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকার। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে ক্যাবিনেটের যেকোনো মন্ত্রীর যেকোনো সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়ার বা তাতে ভেটো (Veto) দেওয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চলে এল সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর হাতে।

কী ছিল বিগত একান্ন বছরের নিয়ম?

মহারাষ্ট্রের প্রশাসনিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারগুলির আমলে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে অসীম ক্ষমতা ছিল এবং তাঁরা মন্ত্রীদের বৈধ সিদ্ধান্তেও হস্তক্ষেপ করতে পারতেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার সেই নিয়ম বাতিল করে নতুন বিধি প্রবর্তন করে। গত ৫১ বছর ধরে নিয়ম ছিল, সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা ও আইন মেনে কোনো মন্ত্রী কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। সেই দীর্ঘকালীন প্রচলিত নিয়ম এক কলমে বদলে ফেলে ফড়ণবিশ নিজেকে একপ্রকার ‘সুপার সিএম’-এর আসনে বসালেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

জোট শরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বড় সিদ্ধান্ত, বাড়বে কি দূরত্ব?

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মহারাষ্ট্রে বর্তমানে বিজেপি, একনাথ শিন্ডের শিবসেনা এবং অজিত পাওয়ারের এনসিপি-র যৌথ জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। শিন্ডে বর্তমানে রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং অপর উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এনসিপি নেত্রী সুনেত্রা পাওয়ার। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এত বড় একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন আনার আগে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবিশ মন্ত্রিসভার বা জোট শরিকদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা করেননি। শরিক দলগুলিকে অন্ধকারে রেখে এককভাবে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে মহাজোট সরকারের অন্দরে বড় ধরনের ফাটল ধরার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

হঠাৎ কেন এই নিয়মে পরিবর্তন?

মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠমহলের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের সাফাই দিয়ে বলা হচ্ছে, মুম্বই হাইকোর্টের একটি নির্দিষ্ট রায়ের প্রেক্ষিতেই এই আইনি সংশোধন করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছিল। ২০২৩ সালে মহারাষ্ট্রের একটি জেলা সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে সমবায় মন্ত্রীর একটি সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বোম্বে হাইকোর্ট সেই মামলা খারিজ করে দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ১৯৭৫ সালের পর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর সেই বিশেষ ক্ষমতা আর নেই। আদালত জানিয়েছিল, নিয়মাফিক মন্ত্রী কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা মুখ্যমন্ত্রী বাতিল করতে পারেন না। সেই আইনি জটিলতা কাটার জন্যই এই পরিবর্তন।

যদিও প্রশাসনিক মহলের একটি বড় অংশের মতে, আইনি জটিলতা সামলানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী নিজের হাতে এভাবে একচ্ছত্র ক্ষমতা না নিয়েও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পরামর্শ দিয়ে কাজ চালাতে পারabilen। কিন্তু ফড়ণবিশের নির্দেশে রাজ্যের মুখ্য সচিব যে নতুন বিধি জারি করেছেন, তাতে কেবল মন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত বাতিল করাই নয়, বরং যেকোনো দপ্তরের ফাইল তলব করা এবং বিভাগীয় সচিবের কাছ থেকে জবাব চাওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্য সচিব ও অর্থ সচিবের ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আদালতের দোহাই দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নীতি শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *