মানুষের জায়গায় এসে গেল রোবট আর এআই! ব্যাঙ্কিং সেক্টরে বিরাট ধস নামতেই চরম দুশ্চিন্তায় যুবসমাজ

ভারতবর্ষে বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি বরাবরই ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু দেশের এই অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডের ছবিটা এখন দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। ব্যাঙ্কগুলি একের পর এক নতুন শাখা বা বিজনেস পয়েন্ট খুললেও, সেই অনুপাতে কর্মী নিয়োগের হার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর মূল নেপথ্যে রয়েছে ডিজিটাইজেশন, অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (FY26) দেশের শীর্ষ ১০টি বেসরকারি ব্যাঙ্ক সম্মিলিতভাবে ১০ হাজারেরও বেশি কর্মী হারিয়েছে।

শীর্ষ ব্যাঙ্কগুলিতে হু হু করে কমছে কর্মী সংখ্যা

পরিসংখ্যান বলছে, ৩১ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত সমাপ্ত অর্থবর্ষে দেশের শীর্ষ ১০টি বেসরকারি ব্যাঙ্কের মোট কর্মী সংখ্যা ১০,১১৪ জন কমেছে। এর আগের বছরেও প্রায় ৯,৬৩৭টি পদ হ্রাস পেয়েছিল। দেশের চারটি বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাঙ্ক—এইচডিএফসি (HDFC), আইসিআইসিআই (ICICI), অ্যাক্সিস (Axis) এবং কোটাক মাহিন্দ্রা (Kotak Mahindra) একযোগে ১৪,৩৬৪ জন কর্মী ছাঁটাই করেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী ছাঁটাই করেছে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, যেখানে সংখ্যাটি ৬,৬৩৩ জন। তালিকায় এরপরেই রয়েছে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক (৩,৩৪৬ জন), অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক (৩,১১৬ জন) এবং কোটাক মাহিন্দ্রার (১,২৬৯ জন) নাম।

শাখা বাড়ছে অথচ নতুন নিয়োগ থমকে গেছে

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, কর্মী সংখ্যা কমার অর্থ এই নয় যে ব্যাঙ্কগুলির ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উল্টে, এই চারটি বড় ব্যাঙ্ক শুধুমাত্র ২০২৬ অর্থবর্ষেই প্রায় ১,২৮৯টি নতুন শাখা ও কেন্দ্র খুলেছে। একসময় ধারণা করা হতো নতুন শাখা মানেই প্রচুর নতুন চাকরির সুযোগ, কিন্তু সেই সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নতুন কর্মী নিয়োগের গতি নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক এই অর্থবর্ষে মাত্র ৪৫,৯০২ জনকে নিয়োগ করেছে, যা দুই বছর আগের ৮৯,১১৫ জনের প্রায় অর্ধেক। কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও স্থায়ী নিয়োগ ৩১,৬৮৬ থেকে কমে ১৮,৯২৭ জনে নেমে এসেছে।

মানুষের জায়গা নিচ্ছে রোবট ও এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট

এই বদলের নেপথ্যে বড় ভূমিকা নিচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের এমডি ও সিইও শশীধর জগদীশানের মতে, প্রযুক্তি ব্যাক-এন্ডের কাজগুলিকে এতই সহজ করে দিয়েছে যে ব্যাঙ্কগুলি এখন পুরোনো কর্মীদের ব্যাক-এন্ডের কাজ থেকে সরিয়ে সরাসরি কাস্টমার ইন্টারঅ্যাকশন বা গ্রাহক সেবামূলক ভূমিকায় পাঠাচ্ছে।

ব্যাংকগুলি এখন অন্ধের মতো এআই ও রোবটের ওপর ভরসা করছে:

  • অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক: তাদের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বর্তমানে ৮৪,০০০-এরও বেশি কর্মীকে সাহায্য করছে এবং ব্যাঙ্কের ৮১ শতাংশ জিজ্ঞাসার স্বয়ংক্রিয় উত্তর দিচ্ছে।

  • আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক: ১০০-টিরও বেশি স্বয়ংক্রিয় বট বা অটোমেটেড বট চালু করা হয়েছে।

  • আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্ক: তাদের ভয়েস বটগুলি মানুষের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি উৎপাদনশীলতা দিচ্ছে।

  • ফেডারেল ব্যাঙ্ক: তারা ইতিমধ্যেই ৩৮৫টিরও বেশি কাজ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড করে ফেলেছে।

মাঝারি আকারের কিছু ব্যাঙ্ক যেমন ফেডারেল, ইন্ডাসইন্ড বা ইয়েস ব্যাঙ্ক সামান্য পরিমাণে কর্মী বাড়ালেও সামগ্রিকভাবে বেসরকারি ব্যাঙ্কিং সেক্টরে স্থায়ী চাকরির সুযোগ যে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। প্রযুক্তির এই আগ্রাসন আগামী দিনে আরও বড় ছাঁটাইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *