হট্টগোলে পণ্ড সংসদ! লোকসভা-রাজ্যসভার অচলাবস্থায় জলে গেল জনগণের ১৭৫ কোটি টাকা?

আজ, ১৩ই আগস্ট, ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে সংসদের অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও বিশৃঙ্খল বর্ষাকালীন অধিবেশন। তবে আগের বারের মতোই এই অধিবেশনও দুই কক্ষের তুমুল হট্টগোল, স্লোগান এবং বারবার মুলতবির সাক্ষী থাকল। লোকসভায় বন্দে মাতরম গাওয়ার পর কক্ষ মুলতবি করা হয় এবং রাজ্যসভায় প্রায় এক ঘণ্টা তীব্র বিতর্কের পর অধিবেশন শেষ হয়। পুরো অধিবেশন জুড়েই অনুদান বিতর্ক, যন্তর মন্তরে ছাত্র বিক্ষোভ ও পুলিশি লাঠিচার্জ এবং এফসিআরএ বিলের মতো ইস্যুগুলি উত্তপ্ত করে রেখেছিল সংসদ চত্বর।
পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চ (PRS Legislative Research)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই অধিবেশনে মোট ১৯টি বৈঠক নির্ধারিত ছিল, যেখানে সম্মিলিতভাবে ১১৪ ঘণ্টার কাজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লাগাতার হট্টগোলের জেরে দুই কক্ষই সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে বহুদূরে সরে আসে। পরিসংখ্যান বলছে, এই পুরো অধিবেশনে সবমিলিয়ে নষ্ট হয়েছে ১৭৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট মূল্যবান সময়। আর সংসদীয় কার্যকারিতা না থাকায় রাজনীতিবিদদের এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বিতর্কের জেরে সাধারণ করদাতাদের পকেট থেকে অপচয় হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।
লোকসভা ও রাজ্যসভার উৎপাদনশীলতার শোচনীয় চিত্র
পিআরএস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যসভার কার্যকারিতা বা উৎপাদনশীলতা ছিল মাত্র ৩৯.১৭ শতাংশ। যেখানে প্রায় ১১৪ ঘণ্টা কাজ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কক্ষটি সচল ছিল মাত্র ৩৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট। অর্থাৎ প্রায় ৭৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের কাজ সম্পূর্ণভাবে পণ্ড হয়ে যায়। বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে অচলাবস্থার জেরে প্রতিদিন বারবার সভা মুলতবি করতে বাধ্য হন কক্ষের স্পিকার। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক এড়িয়ে যেতে চাইছে, অন্যদিকে শাসক পক্ষের পালটা দাবি ছিল তারা সব বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত ছিল।
তবে রাজ্যসভার চেয়েও করুণ দশা ছিল লোকসভার। চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে লোকসভার উৎপাদনশীলতা তলিয়ে মাত্র ১৯ শতাংশে ঠেকেছে। অধিবেশন সাকুল্যে মাত্র ১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট চলেছে, যার ফলে পণ্ড হয়েছে প্রায় ৯৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের কাজ। লোকসভাতেও বহু গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ বা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি পাশ করাতে হয়। শেষ দিনও শাসক ও বিরোধী শিবিরের অনড় মনোভাবের কারণে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য লোকসভা মুলতবি ঘোষণা করা হয়।
আইন পাস বনাম আলোচনার খতিয়ান
হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেও অবশ্য ১২টি বিল দুই কক্ষেই পাশ করিয়ে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায় প্রতিরোধ বিল, জাতীয় সম্মাননা বিল, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সংখ্যা সংক্রান্ত বিল, এমএসএমই বিল, কর ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিল, ট্রাইব্যুনাল সংস্কার বিল, কেরালা রাজ্যের নাম পরিবর্তন বিল এবং এমএমডিআর (MMDR) সংশোধনী বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলি রয়েছে।
তবে বিল পাশ হওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনার সময় ছিল অত্যন্ত সীমিত। পাবলিক পরীক্ষা (নকল-বিরোধী) বিলটি নিয়ে লোকসভায় ১০ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট এবং রাজ্যসভায় ৬ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট (মোট ১৭ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট) দীর্ঘ আলোচনা হলেও, বাকি অধিকাংশ বিলই লোকসভায় মাত্র ৩ থেকে ১৪ মিনিটের সংক্ষিপ্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে পাশ হয়ে যায়। রাজ্যসভায় অবশ্য তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি সময় ধরে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সবমিলিয়ে, কাজের চেয়ে প্রতিবাদের শব্দে উত্তাল থাকা এই অধিবেশন দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রইল।