উৎসবের আগেই আকাশ ছুঁতে চলেছে গাড়ির দাম! রাবার-স্টিলের লাগামছাড়া মুল্যবৃদ্ধিতে মাথায় হাত ক্রেতাদের

আসন্ন উৎসবের মরসুমের আগেই বড়সড় আর্থিক চাপের মুখে দেশের গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো। ইস্পাত, রাবার, অ্যালুমিনিয়াম, তামা থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রয়োজনীয় সমস্ত কাঁচামালের দাম লাগাতার বেড়ে যাওয়ায় আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে গাড়ি তৈরির খরচ। এর ফলে যেমন একদিকে মার খাচ্ছে কোম্পানিগুলোর মুনাফা, তেমনই সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নতুন গাড়ি আসা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় শঙ্কা।

চলতি অর্থবর্ষের শুরুতে যাত্রীবাহী গাড়ি, দু-চাকার যান এবং বাণিজ্যিক গাড়ির চাহিদা বাজারে বেশ চাঙ্গা থাকলেও, এই বর্ধিত খরচ কোম্পানিগুলো নিজেরাই বহন করবে নাকি তার পুরো বোঝা গ্রাহকদের পকেটে চাপাবে—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র জল্পনা। উৎসবের ঠিক আগে এই মূল্যবৃদ্ধির কোপ যে সার্বিক বিক্রির ওপর পড়তে পারে, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞরা।

কাঁচামালের রেকর্ড মূল্যে বিপর্যস্ত শিল্প

টাটা মোটরসের এমডি এবং সিইও গিরিশ ওয়াঘ জানিয়েছেন, বিভিন্ন কাঁচামালের লাগামছাড়া দামের কারণে বাণিজ্যিক যানবাহন ব্যবসা মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে কেবল ইস্পাতের পেছনেই মোট খরচের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়। যতদিন না সেফগার্ড ডিউটি তুলে নেওয়া হচ্ছে, ততদিন ইস্পাতের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই তাঁর মত।

পাশাপাশি, রাবার, অ্যালুমিনিয়াম এবং তামার দামও হু হু করে বেড়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রিক ভেহিকল বা ইভি (EV)-র রমরমার কারণে তামার চাহিদা ও দাম দুটোই রেকর্ড গড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে তামার দাম প্রায় ১০ শতাংশ, স্টিলের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ এবং রাবারের দাম এক লাফে প্রায় ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং শ্রমিকের মজুরিও।

ইতিমধ্যেই দাম বাড়াতে শুরু করেছে কোম্পানিগুলি

পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই আংশিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। মারুতি সুজুকি গত জুন মাসেই গড়ে প্রায় ০.৫ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে এবং আগস্ট মাসেও দাম আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। হোন্ডা কারস ইন্ডিয়াও আগস্ট থেকে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, হুন্ডাই মোটর ইন্ডিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাজার পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাবছে।

টায়ার এবং যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক সংস্থাও এই সংকটের বাইরে নয়। সিয়াটের এমডি এবং সিইও অর্ণব ব্যানার্জী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তাঁদেরও বাধ্য হয়ে টায়ারের দাম বাড়াতে হতে পারে। সোনা কমস্টারের সিইও বিবেক সিংয়ের মতে, তাঁর পুরো কেরিয়ারে ইস্পাত, তামা ও সেমিকন্ডাক্টরের এমন রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি তিনি দেখেননি।

উৎসবের মরসুমই আসল চ্যালেঞ্জ

অটোমোবাইল সংস্থারগুলোর কাছে বছরের এই সময়টা ব্যবসা করার সবচেয়ে বড় সুযোগ। কিন্তু দাম লাগাতার বাড়তে থাকলে উৎসবের মরসুমে ক্রেতারা গাড়ি কেনা স্থগিত করতে পারেন, যা বাজারের গতি শ্লথ করে দিতে পারে। কোম্পানিগুলোর সামনে এখন মূলত তিনটি রাস্তা খোলা রয়েছে—খরচ নিজে বহন করা, খরচ কমানো কিংবা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই বাড়তি খরচের বোঝা নিজেদের ঘাড়ে নেওয়া অসম্ভব। ফলে আগামী মাসগুলোতে গাড়ির দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। এখন দেখার, চড়া দামের বাজারে ক্রেতারা কতদিন এই মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেন এবং চাহিদা কোন পর্যায়ে গিয়ে ধাক্কা খায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *