ট্যাক্সি ও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের অ্যালঝেইমার্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম! চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এল নতুন গবেষণায়

পেশাগত জীবনের নানা চাপ এবং মানসিক অবসাদের কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। তবে সম্প্রতি এক অপ্রত্যাশিত গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা গেছে, পেশাদার ট্যাক্সি এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকদের মধ্যে অ্যালঝেইমার্স (Alzheimer’s disease) রোগে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম। গবেষকদের মতে, এই পেশার মানুষদের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রুট বা রাস্তা খুঁজে বের করা এবং মস্তিষ্কে মেন্টাল ম্যাপ তৈরি করার কসরতই এই ইতিবাচক ফলের নেপথ্যে থাকতে পারে। তবে এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণিত করে না যে নেভিগেশন করলেই অ্যালঝেইমার্স পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কী বলছে গবেষণা?
২০২৪ সালে ‘বিএমজে’ (BMJ)-তে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ লক্ষ মৃত্যুসনদ (death certificates) খতিয়ে দেখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৪৩টি পেশাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী:

ট্যাক্সি চালকদের মোট মৃত্যুর মধ্যে মাত্র ১.০৩% এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকদের ক্ষেত্রে ০.৭৪% মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যালঝেইমার্স।

যেখানে সমগ্র সমীক্ষাকৃত জনসংখ্যার ক্ষেত্রে এই হার ছিল গড়ে ৩.৮৮%।

বয়স, লিঙ্গ, জাতি, বর্ণ এবং শিক্ষার মতো বিষয়গুলি সমন্বয় করার পরেও দেখা গেছে এই দুটি পেশার মানুষদের মধ্যেই অ্যালঝেইমার্সজনিত মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম। তবে মজার বিষয় হলো, অন্যান্য পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই প্যাটার্ন দেখা যায়নি। বাস চালক, বিমান চালক কিংবা জাহাজ চালকদের কাজের রুট মূলত নির্দিষ্ট বা পূর্বনির্ধারিত থাকে, তাই তাঁদের মধ্যে এই ধরনের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

নেভিগেশন কীভাবে ব্রেনকে আলাদাভাবে সাহায্য করে?
গবেষকদের ধারণা, ঘন ঘন স্পেশিয়াল নেভিগেশন বা দিক নির্ণয়ের কাজটি মস্তিষ্কের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ মস্তিষ্কের যে অংশটি স্মৃতিশক্তি এবং দিক নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (হিপোক্যাম্পাস বা hippocampus), অ্যালঝেইমার্স রোগে সেই অংশটিই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লন্ডনের ট্যাক্সি চালকদের নিয়ে এর আগে করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য তাদের যে তীব্র নেভিগেশন ট্রেনিং নিতে হয়, তাতে তাদের হিপোক্যাম্পাসের গঠনেও পরিবর্তন আসে। এর থেকেই গবেষকদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে, নিয়মিত নেভিগেশনের অভ্যাস মস্তিষ্কের গঠন এবং কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে কি না।

স্পেশিয়াল থিংকিং বা স্থানিক চিন্তার গুরুত্ব
স্থানিক যুক্তি বা স্পেশিয়াল রিজনিং কেবল পেশাদার চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ম্যাপ পড়া, ভূগোল চর্চা, জিপিএস বা জিআইএস (GIS) কাজ, রুট পরিকল্পনা করা, পাজল বা ধাঁধা মেলানো—এই ধরনের কাজগুলো মানুষকে স্থান এবং দিকের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, নেভিগেশনকে অ্যালঝেইমার্স প্রতিরোধের একটি পরীক্ষিত উপায় হিসেবে এখনই গণ্য করা উচিত নয়। বিএমজে-র এই গবেষণাটি মূলত পর্যবেক্ষণমূলক (observational) এবং এটি সরাসরি মস্তিষ্কের পরিবর্তন বা রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া পরিমাপের পরিবর্তে মৃত্যুর রেকর্ড খতিয়ে দেখেছে। তাই গবেষকরা একে কেবল ‘হাইপোথিসিস-জেনারেটিং’ বা অনুমানের সূচনা হিসেবে দেখছেন এবং আরও ব্যাপক গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন।

তা সত্ত্বেও, এই গবেষণাটি একটি উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা দেয় যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা কতটা জরুরি। সেই সঙ্গে পরীক্ষিত চিকিৎসাগত পরামর্শের সঙ্গে এই ধরনের সম্ভাবনাময় যোগসূত্রগুলোকে গুলিয়ে না ফেলারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *