বাজার করতে গিয়ে নিখোঁজ! ‘অবৈধ অভিবাসী’ সন্দেহে নবি মুম্বইয়ের বাঙালি গৃহবধূকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার অভিযোগ স্বামীর

রাতের খাবার কেনার জন্য বাড়ির কাছের বাজারে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর এক ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন নবি মুম্বইয়ের এক বাঙালি গৃহবধূ। ‘অবৈধ অভিবাসী’ সন্দেহে সাহিদা ফকির নামের ওই মহিলাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মুম্বই পুলিশের বিরুদ্ধে। সমস্ত বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের আকস্মিক পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?
গত ১৯ জুলাই সন্ধেয় ১০ বছরের ছেলেকে ঘরে রেখে নবি মুম্বইয়ের বাড়ি থেকে রাতের খাবার কিনতে বেরিয়েছিলেন সাহিদা ফকির। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও তিনি বাড়ি ফেরেননি। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাহিদার স্বামী জুম্মান ফকিরের ফোনে মুম্বই পুলিশের চেম্বুর ক্রাইম ব্রাঞ্চ থেকে ফোন আসে। তাঁকে জানানো হয়, ‘অবৈধ অভিবাসী’ সন্দেহে সাহিদাকে আটক করা হয়েছে।
এরপরই শুরু হয় বৈধ নথিপত্র নিয়ে থানায় ছোটাছুটি। স্বামীর দাবি, সাহিদাকে এমন একটি জায়গায় আটকে রাখা হয়েছিল যেখানে সন্দেহভাজন বিদেশি ও অবৈধ অভিবাসীদের রাখা হয়। এমনকি তাঁর কাছ থেকে খাবারের প্যাকেট, মোবাইল ফোন এবং পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়। পুলিশের কাছে সাহিদার জন্মের শংসাপত্র-সহ সমস্ত পরিচয়পত্র জমা দেওয়া হলেও, সেগুলি ‘যথেষ্ট নয়’ বলে দাবি করা হয় এবং সাহিদার বাবা-মায়ের জন্মের শংসাপত্র তলব করা হয়।
বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ ও পরিবারের লড়াই
জুম্মানের দাবি অনুযায়ী, টানা চার দিন থানায় চক্কর কাটার পর গত ২৩ জুলাই তাঁকে জানানো হয় যে সাহিদা আর সেখানে নেই। পরে তিনি জানতে পারেন, সাহিদাকে জোর করে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি কিছুদিন পর বাংলাদেশ থেকেই তাঁর ফোনে একটি কল আসে। স্বামী জুম্মানের দাবি, সাতক্ষীরা জেলার সোনাবাড়িয়া এলাকার একটি স্থানীয় পরিবার বর্তমানে সাহিদাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে সেখানেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এবং স্থানীয় পুলিশের নজরদারির কারণে ওই পরিবারটির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
কী কী নথি রয়েছে পরিবারের কাছে?
সাহিদার নাগরিকত্ব ও বৈধতা প্রমাণ করতে পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিক পোক্ত নথি পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে:
২০০৮ সালের ভোটার পরিচয়পত্র।
১৯৮৮ সালে উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপদহ গ্রামে জন্ম সংক্রান্ত শংসাপত্র।
স্কুল সার্টিফিকেট এবং গোবিন্দপুরে তাঁর নামে থাকা জমির মালিকানার নথি।
সাহিদার বাবার মৃত্যুর শংসাপত্র এবং ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও তাঁর বাবা-মায়ের নাম থাকার প্রমাণ।
গোবিন্দপুরের বাসিন্দারাও গত ৫ অগস্ট উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে সাহিদাকে নিরাপদে ভারতে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর বক্তব্য, সাহিদার বাবা ও দাদার পরিবার ওই এলাকার দীর্ঘকালীন স্থায়ী বাসিন্দা। প্রায় দুই দশক আগে স্বামীর সঙ্গে কাজের সন্ধানে তাঁরা মুম্বই পাড়ি দিয়েছিলেন, যেখানে সাহিদা গৃহপরিচারিকা এবং জুম্মান গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতেন।
মানবাধিকার সংগঠনের হস্তক্ষেপ ও পূর্বের ঘটনা
এই ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ সরব হয়েছে। গত ২৩ জুলাই সংগঠনের পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়ে এই বেআইনি আটক, ত্রুটিপূর্ণ পরিচয় যাচাই এবং ভিন্ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। তাঁদের বক্তব্য, শুধুমাত্র অন্ধ সন্দেহ বা প্রোফাইলিংয়ের ভিত্তিতে কাউকে বিদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, এর আগে দিল্লি থেকে সোনালিকা খাতুন ও তাঁর আট বছরের ছেলেকে একইভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। এবার সাহিদার ক্ষেত্রেও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তাঁকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সুপ্রিম কোর্ট বা উচ্চ আদালতের ওপর ভরসা রাখছে তাঁর পরিবার।