১০৯ বছর আগের ব্রিটিশ আমলের এক টুকরো কাগজ! ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকার এই রহস্যে তোলপাড় নেটদুনিয়া

বন্ড বা ঋণপত্র কোনো নতুন বিনিয়োগের মাধ্যম নয়। এর ঐতিহ্য একশো বছরেরও বেশি পুরোনো, যার এক অবিশ্বাস্য প্রমাণ সম্প্রতি পাওয়া গেছে মধ্যপ্রদেশে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের একটি পরিবার ১০৯ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক ‘ওয়ার লোন’ সার্টিফিকেট বা যুদ্ধ ঋণ শংসাপত্র খুঁজে পেয়েছে। আর এই একটিমাত্র পুরনো নথি ঘিরেই বর্তমানে কোটি টাকার একটি চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন দানা বেঁধেছে: ১৯১৭ সালে বিনিয়োগ করা ৩৫,০০০ টাকার মূল ঋণ যদি কখনও পরিশোধ না হয়ে থাকে, তবে আজ তার বর্তমান বাজারমূল্য কত হতে পারে?
১৯১৭ সালের সেই ঐতিহাসিক বিনিয়োগ
ভারতের ব্রিটিশ শাসনকালে জারি করা ওই প্রাচীন সার্টিফিকেট থেকে জানা যায় যে, ভোপাল রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘সেঠ রাম কিষাণ জাসকরণ রুথিয়া’-র সেঠ জুম্মা লাল রুথিয়া ১৯১৭ সালের ৪ জুন ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার লোনে’ মোট ৩৫,০০০ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক ব্যয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার এই ধরনের ঋণপত্র বা যুদ্ধ ঋণ চালু করেছিল, যেখানে বিনিয়োগকারীদের ভালো মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। ১৯১৭ সালের ইন্ডিয়ান ওয়ার লোনের ক্ষেত্রে সুদের হার ধার্য করা হয়েছিল বার্ষিক ৫.৫ শতাংশ।
পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, যদি এই ৫.৫ শতাংশ হারে ১০৯ বছর ধরে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সুদ (Compound Interest) হিসাব করা হতো, তবে ২০২৬ সাল নাগাদ সেই মূল ৩৫,০০০ টাকার পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১.২ কোটি টাকায় দাঁড়াত। বিকল্পভাবে, পরিবারটি বিগত ১০৯ বছরে সোনা বা রূপার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গেও এর তুলনা টেনেছে। তাদের দাবি, যদি সোনার দামের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে এই অর্থের পরিমাণ ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক গাণিতিক হিসাব বা অনুমান মাত্র। এর অর্থ এই নয় যে রুথিয়া পরিবার ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার আইনি অধিকারী, কিংবা যুক্তরাজ্য সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যে এই অর্থ এখনও বকেয়া রয়েছে।
ইউকে (UK) কর্তৃপক্ষের কড়া নজর ও আসল নথির খোঁজ
‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬৩ বছর বয়সি বর্তমান বংশধর রুথিয়া সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিস (Debt Management Office) থেকে তাঁদের পারিবারিক দাবি নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক জবাব পেয়েছেন। ব্রিটিশ ডেট ম্যানেজমেন্ট অথরিটির নজরে বিষয়টি আসার পর তাদের আইনি দলের পক্ষ থেকে একটি ইমেল পাঠিয়ে আসল পুরনো লোন সার্টিফিকেট এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত চিঠিপত্রের কপি জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে রুথিয়া জানান, “আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি কখনোই ভাবিনি যে এই বয়সে এসে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাব। তবে এখন এটি কেবল টাকার অঙ্ক নয়, এটি আমাদের কাছে সম্মানের লড়াই।” বর্তমানে তাঁদের আইনি টিম ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব পেশ করার জন্য সমস্ত পুরনো নথিপত্র এবং ঐতিহাসিক রেকর্ড জোগাড় করছে।
ব্রিটিশদের কাছে জবাবদিহিতার দাবি
১৯৩৭ সালে বিনিয়োগকারী সেঠ জুম্মা লাল রুথিয়ার জীবনাবসান ঘটে এবং এর ঠিক দশ বছর পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চিরতরে চলে যায়। পরিবারের দাবি, ব্রিটিশ আমলের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁদের সেই ঋণের আসল টাকা বা লোন সেটেলমেন্টের কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি।
পরিবারের স্পষ্ট বক্তব্য, ব্রিটিশ সরকার যদি সত্যিই সেই সময় অর্থ নিয়ে থাকে, তবে তার হিসাব বা রেকর্ড কোথাও না কোথাও থাকা উচিত। এখন দেখার বিষয়, ১০9 বছর পুরোনো এই ঐতিহাসিক বন্ডের সূত্র ধরে ব্রিটিশ প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয় এবং এই দীর্ঘ রহস্যের কোনো যৌক্তিক সমাধান সূত্র মেলে কি না!