পাচতারা হোটেলের বিলাসবহুল খাবার খাচ্ছেন তো? ফাঙ্গাস পড়া সবজি ও পচা মাংসে সর্ষেল ফুল দেখছে বেঙ্গালুরু!

নামী পাঁচতারা হোটেল মানেই উন্নত পরিষেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং খাবারের নিখুঁত মান—সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণাই চিরকাল গেঁথে রয়েছে। কিন্তু বেঙ্গালুরুর একাধিক বিলাসবহুল হোটেলে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক অভিযান সেই ধারণার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ঝাঁ চকচকে হোটেলের রান্নাঘরের অন্দরে লুকিয়ে থাকা পচা সবজি, মেয়াদ-উত্তীর্ণ দুধ, মাংস এবং চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতেই শিউরে উঠেছে শহরবাসী।

বিশেষ অভিযানে নগ্ন সত্য
সম্প্রতি কর্নাটকের খাদ্য সুরক্ষা ও ওষুধ প্রশাসন বিভাগ (Food Safety and Drug Administration Department) বেঙ্গালুরু শহরের ৩-তারকা ও ৫-তারকা হোটেলগুলিতে একটি বিশেষ অভিযান চালায়। মোট ৩০টি বিশেষ দল গঠন করে বেঙ্গালুরু আরবান জেলার বিভিন্ন বিবিএমপি (BBMP) জোনের ২৬টি বিলাসবহুল হোটেলে একযোগে এই পরিযান চালানো হয়।

কোথায় কী মিলল?
তদন্তে একাধিক প্রথম সারির হোটেলে খাদ্য সুরক্ষা বিধি লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও রান্নাঘর ও স্টোরেজ এলাকায় ছিল চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কোথাও মজুত ছিল মেয়াদ-উত্তীর্ণ খাবার, আবার কোথাও সবজিতে দেখা মিলেছে ফাঙ্গাসের।

দ্য ললিত অশোক (অ্যানেক্স সাউথ): এই হোটেল থেকে মোট ৭৬ কেজি মাংস, ২০০ কেজি পচা সবজি এবং ৩২ লিটার মেয়াদ-উত্তীর্ণ দুধ বাজেয়াপ্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে নষ্ট করা হয়।

র‌্যাডিসন ব্লু (দ্য অ্যাট্রিয়া): অভিযানে সবচেয়ে বড় উদ্ধারকার্য চলে এখানেই। এই হোটেল থেকে মোট ১০৫ কেজি মেয়াদ-উত্তীর্ণ খাবার বাজেয়াপ্ত করা হয়— যার মধ্যে ছিল ৫০ কেজি চিকেন, ২৫ কেজি রেড মিট, ২৩ কেজি মাছ এবং ৭ কেজি সবজি।

তাজ যশবন্তপুর: এখান থেকে মোট ৭২ কেজি মাংস ও মাছ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

সাংরি-লা বেঙ্গালুরু: ১৫ কেজি মাংস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

ফোর সিজনস হোটেল বেঙ্গালুরু: ১৯ কেজি মাংস বাজেয়াপ্ত করা হয়।

ভিভান্টা বেঙ্গালুরু হোয়াইটফিল্ড: ৩ কেজি মেয়াদ-উত্তীর্ণ বেকারি সামগ্রী ধ্বংস করা হয়েছে।

ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ
শুধু খাদ্যসামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেই ক্ষান্ত থাকেননি খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকরা। অভিযان চলাকালীন বিভিন্ন হোটেল থেকে মোট ৩৫টি খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চিকেন, মাটন, মাছ, দুধ, রান্নার তেল, মশলা, চা পাউডার, চিজ, টমেটো সস এবং লেবুর রসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপাদান।

নমুনাগুলি ইতিমধ্যেই পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ল্যাব রিপোর্টের ফল হাতে আসার পরেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছে দফতর।

কী কী গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে?
তদন্তকারী দল হোটেলগুলির রান্নাঘরে গিয়ে যে সমস্ত ত্রুটি ও অনিয়ম দেখতে পেয়েছে, তার একটি দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে:

অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘর ও স্টোরেজ এলাকা

মেয়াদ-উত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রীর ব্যবহার

শাকসবজিতে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক সংক্রমণ

খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার প্রবণতা

বিভ্রান্তিকর বা ভুল লেবেলিংযুক্ত খাদ্যপণ্য (Misbranded food products)

এফএসএসআই (FSSAI)-এর নির্দিষ্ট লেবেলিং নির্দেশিকা না মানা

নিরামিষ ও আমিষ খাবারের জন্য পৃথক স্টোরেজ বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না রাখা

যে সমস্ত ফুড বিজনেস অপারেটরদের (Food Business Operators) রান্নাঘরে এই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে, তাঁদের ইতিমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। অভিযোগগুলি ল্যাব টেস্টে প্রমাণিত হলে ‘খাদ্য সুরক্ষা ও মান আইন, ২০০৬’ (Food Safety and Standards Act, 2006) অনুযায়ী কঠোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।

প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি
কর্্নাটকের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউ টি খাদার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রাজ্যের নামী হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলি যাতে খাদ্য সুরক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতার বিধি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করলে এবং নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

বেঙ্গালুরুর এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ফের একবার সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— তবে কি চড়া মূল্যের পাঁচতারা হোটেলের খাবার মানেই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর নয়? এখন সকলের নজর পরীক্ষাগারের রিপোর্টের দিকে এবং তার ভিত্তিতে প্রশাসন কী কড়া পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *