মামলায় অভিযুক্ত মানেই কি দেশ ছাড়ার বন্দোবস্ত? পাসপোর্ট নিয়ে ঐতিহাসিক রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট

কোনও ব্যক্তি আইনি মামলায় অভিযুক্ত হলেই তাঁর পাসপোর্ট পাওয়ার আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। ভোটার কার্ড বা আধার কার্ডের মতো পাসপোর্টও একজন ভারতীয় নাগরিকের নাগরিকত্বের অন্যতম প্রধান পরিচয়পত্র। একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে এই স্পষ্ট রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, বিদেশ যাত্রা এবং পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। শুধুমাত্র কারও বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলেই তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া যাবে না।

মামলার নেপথ্য কাহিনী
জানা গিয়েছে, রাঁচির বিশেষ আদালতে মামলাকারী অমিত কুমার আগরওয়ালের বিরুদ্ধে পিএমএলএ (PMLA)-এর অধীনে দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে তা রিনিউ করার আবেদন জানান।

সেই সময় রাঁচির বিশেষ আদালত জানায়, বিচারব্যবস্থার অনুমতি ছাড়া ওই ব্যক্তি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না এবং পাসপোর্ট পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে তা আদালতে জমা করতে হবে। তবে পাসপোর্টের মেয়াদের সময়সীমা নিয়ে বিশেষ আদালত নির্দিষ্ট কিছু বলেনি। এই সুযোগে কেন্দ্রীয় পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ মাত্র ১ বছরের জন্য ওই ব্যক্তিকে পাসপোর্ট ইস্যু করে দেয়। এর পরেই আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অমিত কুমার।

বিদেশ মন্ত্রকের যুক্তি খারিজ হাইকোর্টের
মামলার শুনানিতে বিদেশ মন্ত্রক আদালতের সামনে ১৯৯৩ সালের একটি বিজ্ঞপ্তির প্রসঙ্গ টানে। তাদের দাবি ছিল, যদি বিশেষ আদালত নির্দিষ্ট করে মেয়াদের কথা না বলে দেয়, তবে ১ বছরের বেশি মেয়াদের পাসপোর্ট দেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ।

তবে বিদেশ মন্ত্রকের এই যুক্তি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেন বিচারপতি কৃষ্ণা রাও। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান:

“একজন ভারতীয় নাগরিকের নাগরিকত্বের অন্যতম পরিচয়পত্র হল পাসপোর্ট। কেউ পাসপোর্ট রিনিউ করাচ্ছেন মানেই তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবেন, এমনটা ভাবার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।”

আদালতের পর্যবেক্ষণে যা উঠে এল
কলকাতা হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত জোরালো সুরে জানিয়েছে:

ভিত্তিহীন আশঙ্কা: অভিযুক্ত ব্যক্তি বিদেশ পালিয়ে যেতে পারেন—এই ধরনের অযৌক্তিক আশঙ্কার উপর ভিত্তি করে কাউকে মাত্র ১ বছরের জন্য পাসপোর্ট ইস্যু করা আইনসঙ্গত নয়।

অপ্রয়োজনীয় হয়রানি: প্রতি বছর পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া নাগরিকদের জন্য এক অহেতুক ও জটিল প্রক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

দায়িত্বের বিভাজন: বিদেশ যাত্রার ওপর বিধিনিষেধ বা শর্ত আরোপ করা আদালতের কাজ, কিন্তু তার আইনি মর্যাদা অনুসারে পাসপোর্টের স্বাভাবিক মেয়াদ (১০ বছর) নির্ধারণ করা পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

হাইকোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশ
আদালত সাফ জানিয়েছে, পাসপোর্ট ১০ বছরের জন্য রিনিউ করা হলে চলমান তদন্ত প্রক্রিয়ার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। রায়দানের পর আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে মামলাকারীর পাসপোর্ট ১০ বছরের জন্য রিনিউ করে দেওয়ার ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছেন বিচারপতি কৃষ্ণা রাও।

তবে হাইকোর্ট এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মামলাকারীকে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ আদালতের পূর্বানুমতি নেওয়ার শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। আইনি লড়াইয়ে এই রায়ের ফলে দেশের বহু বিচারাধীন বন্দি ও অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন বলেই মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *