রণবীর কাপুর বা অরুণ গোভিলের অনেক আগেই যিনি ছিলেন পর্দার ‘রাম’! রূপোলি দুনিয়ার প্রথম ভগবান শ্রীরাম কে?

পরিচালক নিতেশ তিওয়ারির আসন্ন ছবি ‘রামায়ণ’-এ রণবীর কাপুর পর্দায় রাম হিসেবে হাজির হওয়ার অনেক আগে, কিংবা ১৯৮৭ সালে রামানন্দ সাগরের মহাকাব্যিক ‘রামায়ণ’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে অরুণ গোভিল কোটি কোটি মানুষের কাছে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠার বহু আগেই— এক অভিনেতা চরিত্রটিকে নিজের করে নিয়েছিলেন। তিনি হলেন কিংবদন্তি অভিনেতা প্রেম আদিব। রুপোলি পর্দায় মোট ৯টি চলচ্চিত্রে ভগবান রামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি।

চরিত্রটিকে তিনি এতটাই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে দর্শকরা অন্য কোনও রূপে তাঁকে কল্পনাই করতে পারতেন না। সিনেপর্দাকে যেন এক শান্ত ভক্তিময় আবহে ভরিয়ে তুলেছিলেন এই অভিনেতা।

গান্ধীর দেখা একমাত্র চলচ্চিত্র ও ঐতিহাসিক সূচনা
রাম হিসেবে প্রেম আদিবের রূপোলি পর্দার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪২ সালে বিজয় ভাট পরিচালিত ‘ভারত মিলাপ’ ছবির মাধ্যমে। ছবিটি দর্শকদের মন জয় করে নেয়। এর পরেই পরের বছর (১৯৪৩) বিজয় ভাট তাঁকে ‘রাম রাজ্য’ ছবিতে আবারও একই চরিত্রে অভিনয় করান।

এই ছবিটির এক বিরল ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে— এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা মহাত্মা গান্ধী তাঁর জীবদ্দশায় দেখেছিলেন! পর্দায় প্রেম আদিবের সেই শান্ত, সংযত উপস্থিতি দেখতে দর্শকরা বারবার প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমাতেন।

৯ বার রামের ভূমিকায় অনন্য রেকর্ড
একে একে প্রেম আদিব রাম হিসেবে ফিরে আসেন:

‘রামবাণ’

‘রাম বিবাহ’

‘রাম নবমী’

‘রাম হনুমান যুদ্ধ’

‘রাম লক্ষ্মণ’

‘রাম ভক্ত বিভীষণ’

১৯৫৪ সালের ‘রামায়ণ’ (বিজয় ভাটের আগের তিনটি ছবির সংকলন)

সব মিলিয়ে মোট ৯ বার তিনি রামের ভূমিকায় অভিনয় করেন। বিশেষ করে ‘রাম বিবাহ’ চলচ্চিত্রটি ছিল অত্যন্ত বিশেষ। ছবিটির প্রযোজক, পরিচালক এবং রামের ভূমিকায়— সব দায়িত্বেই ছিলেন খোদ প্রেম আদিব। যে গল্প তাঁর পরিচয় তৈরি করেছিল, তার ওপর কোনো অভিনেতার এই ধরনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত।

ঠাকুরঘরে স্থান পেয়েছিল এই জুটি
১৯৪৩ থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত রাম ও সীতার ভূমিকায় প্রেম আদিব এবং শোভনা সমর্থ-র জুটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, তৎকালীন ধর্মীয় পত্রিকা, ক্যালেন্ডার এবং এমনকী বাসাবাড়ির ঠাকুরঘরে বা মন্দিরেও তাঁদের ছবি স্থান পেত। ট্রিলোক কাপুর, মহিপাল বা শাহু মোদকের মতো অভিনেতারাও পরে রামের চরিত্রে অভিনয় করলেও প্রেম আদিবের মতো গভীর ছাপ আর কেউ ফেলতে পারেননি।

শিব প্রসাদ থেকে ‘প্রেম আদিব’ হয়ে ওঠার লড়াই
১৯১৭ সালে এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে জন্ম নেন শিব প্রসাদ আদিব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁর ঠাকুরদাকে অওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ‘আদিব’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। বহু প্রজন্ম আগেই তাঁদের পরিবার কাশ্মীর থেকে উত্তর প্রদেশে চলে আসে।

ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকায় পরিবারকে না জানিয়েই বোম্বে (বর্তমান মুম্বই) চলে আসেন তরুণ শিব প্রসাদ। ১৯৩৬ সালে পরিচালক মোহন সিনহা তাঁকে ‘রোম্যান্টিক ইন্ডিয়া’ ছবিতে সুযোগ দেন এবং নাম বদলে রাখেন ‘প্রেম আদিব’। অন্যান্য ছবিতে আধুনিক ও স্টাইলিশ চরিত্রে অভিনয় করলেও রামের ভূমিকায় নামার সঙ্গে সঙ্গে মার্জিত ভাব ও গাম্ভীর্যের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিতেন তিনি।

অসময়ে চিরবিদায়
সব গল্পের পরিণতি সুন্দর হয় না। ১৯৫৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (ব্রেন হেমারেজ) কারণে মাত্র ৪২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।

আজ যখন বিশাল বাজেট ও বিশ্বমানের প্রযুক্তিতে মহাকাব্যিক গল্প ফের পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠছে, তখন আধুনিক প্রচারের আলো ছাড়াই যিনি এক সম্পূর্ণ প্রজন্মের কাছে প্রথম ‘রাম’ হয়ে উঠেছিলেন, সেই প্রেম আদিবের নীরব রেকর্ড আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রে অনন্য ও অটুট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *