‘ভাবতেই পারছি না আমার মেয়ে এত বড় চক্রে জড়িয়েছে!’ মালদহের সেই বান্ধবীর হাত ধরেই কি জঙ্গি জালে অর্পিতা?

হানি ট্র্যাপে (Honey Trap) ফেলে অপহরণ ও দেশবিরোধী কার্যকলাপের এক চাঞ্চল্যকর চক্রের হদিশ মিলল। বর্ধমানের একটি জিম থেকে হামিম মণ্ডলের গ্রেপ্তারের পর এবার ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থেকে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা STF-এর জালে ধরা পড়েছে তার বান্ধবী ও কলেজছাত্রী অর্পিতা সরকার। এসটিএফ সূত্রে চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে যে, ধৃত হামিমের যেমন সরাসরি পাকিস্তানি জঙ্গি গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, ঠিক তেমনই জঙ্গি শাহজাদ ভাট্টি ও আইএসআই-এর বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট ও নির্দেশ আসত এই অর্পিতার কাছেও। কে এই অর্পিতা এবং কীভাবে সে এই বিপজ্জনক চক্রের মাকড়সার জালে জড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে তদন্ত এগোতেই সামনে আসছে একের পর এক হাড়হিম করা তথ্য।
পরিবারের চোখে অর্পিতা: সরলতা নাকি না বুঝে বড় ভুল?
মেয়ে যে এমন একটি ভয়ংকর ও আন্তর্জাতিক দেশবিরোধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে, তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না অর্পিতার পরিবারের লোকজন।
বাবার দাবি: অর্পিতার বাবা সুজিতকুমার সরকারের দাবি, তাঁর মেয়ে নিজে থেকে কোনো পরিকল্পনা করে এই অপরাধের সঙ্গে জড়ায়নি, বরং ধীরে ধীরে সুকৌশলে তাকে একটি বড় চক্রের মধ্যে টেনে নেওয়া হয়েছে। বাবার দাবি অনুযায়ী, অর্পিতার এক বান্ধবীর মাধ্যমেই মূলত এই যোগাযোগের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই বান্ধবীর বাড়ি মালদায় এবং সে নাকি সবসময় বোরখা পরে থাকত। মালদহের সেই মেয়েটি প্রায়ই বলত, ‘আমাদের ওপর অত্যাচার হয়।’ তবে এরপরে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে পড়ে অর্পিতা এই জঙ্গি নেটওয়ার্কের কোঠায় পা রাখল, তা এখনও স্পষ্ট নয় পরিবারের কাছে।
জেঠুর বক্তব্য: ধৃত অর্পিতার জেঠুর মুখেও এক বন্ধুর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। পরিবারের দাবি, ওই বন্ধুটি প্রায়শই তাঁদের বাড়িতে আসত এবং সবসময় বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলত।
দিদির অভিযোগ: অর্পিতার দিদি নিশা সরকারের পরিষ্কার অভিযোগ, ধৃত হামিম মণ্ডলই মূলত তাঁর বোনকে ব্যবহার করেছে। মিষ্টি কথায় ও প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে বোনকে এই নরকে ঠেলে দিয়েছে হামিম।
সোশ্যাল মিডিয়ার গ্ল্যামার ও হানি ট্র্যাপের ফাঁদ
গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে হাতিয়ার করে তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে সুনিপুণভাবে যোগাযোগ গড়ে তুলত এই জঙ্গি-নেটওয়ার্কটি।
অর্পিতার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে নিয়মিত বাইক রাইডিং, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন লাইফস্টাইল-সংক্রান্ত আকর্ষণীয় ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা হতো।
তদন্তকারীদের জোরালো অনুমান, এই সমস্ত গ্ল্যামারাস ছবি ও ভিডিও দেখেই মূলত টার্গেট করা ব্যক্তিরা আকৃষ্ট হতেন এবং ধীরে ধীরে অর্পিতার পাতা জালে জড়িয়ে পড়তেন।
নিজের আসল অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি একাধিক ভুয়ো প্রোফাইল (Fake Profile) বা অ্যাকাউন্টও ব্যবহার করত অর্পিতা, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের সঙ্গে চটজলদি যোগাযোগ রাখা হতো।
টার্গেটে থাকা ব্যক্তিদের ধীরে ধীরে মগজধোলাই করে নিজেদের কট্টরপন্থী পথে টেনে আনা হতো।
এসটিএফের প্রাথমিক তদন্তে এও স্পষ্ট যে, এই পুরো নেটওয়ার্কে হামিম মণ্ডল এবং অর্পিতা সরকার উভয়েরই মূল ভূমিকা ছিল নতুন সদস্য জোগাড় করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিদেশি হ্যান্ডলারদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রাখা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড বা দেশের অন্য কোনো রাজ্য থেকে এই চক্রের সঙ্গে আর কারা কারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল এবং সেই সম্ভাব্য স্লিপার সেল বা সদস্যরা বর্তমানে ঠিক কোথায় লুকিয়ে রয়েছে, তার সুলুকসন্ধান পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।