ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দু’বছর পূর্ণ! ৫ অগস্ট দিল্লির মাটিতে দাঁড়িয়ে বড় ঘোষণার প্রস্তুতি শেখ হাসিনার

২০২৪ সালের ৫ অগস্ট। ভারতীয় উপমহাদ্রেঞ্জে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সেই ঐতিহাসিক দিনটিতে প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে আকস্মিকভাবে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। দেখতে দেখতে আগামী ৫ অগস্ট তাঁর দেশ ছাড়ার ঠিক দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। আর ঠিক এই তাৎপর্যপূর্ণ দিনটিতেই নয়া দিল্লিতে এক মেগা সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করতে চলেছে আওয়ামী লিগপন্থী একটি সংগঠন। দিল্লির প্রেস ক্লাব তথা ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে আয়োজিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে খোদ শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বা ভিডিও বার্তার পাশাপাশি তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে প্রবল জল্পনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, হাসিনা আমলের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রাক্তন মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও ওই প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত থাকতে পারেন।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও শেখ হাসিনার আইনি লড়াই
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পদ্মাপারের দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক টালবাহানা পেরিয়ে চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং বর্তমানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান।

অন্যদিকে, দেশত্যাগের পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একের পর এক গুরুতর মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং একাধিক মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্তও হয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) তাঁকে গত জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শুনিয়েছে। এই সমস্ত আইনি জটিলতা এবং কঠোর পরিণতির কথা বিলক্ষণ জানেন খোদ শেখ হাসিনাও। তা সত্ত্বেও তিনি যে নিজের দেশ ও মাটিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে অনড়, তা গত মাসেই আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন।

সেবার তিনি জানিয়েছিলেন, সমস্ত আইনি লড়াই ও ঝুঁকি মাথা পেতে নিয়ে আওয়ামী লিগের শীর্ষস্থানীয় ও বড় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তিনি সশরীরে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এমনকি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজের, এর পেছনে কোনো বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপ নেই।

দিল্লির সাংবাদিক বৈঠক ও তসলিমা নাসরিনের মন্তব্য
হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের রূপরেখা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতেই এবার নয়াদিল্লির মাটিতে আসরে নামছে আওয়ামী লিগপন্থী সংগঠন। আগামী ৫ অগস্ট হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির দুই বছর পূর্তির দিনে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে আয়োজিত এই সাংবাদিক বৈঠক থেকে বড় কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হতে পারে বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। বিশেষ করে, এই বৈঠকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতি এবং হাসিনার ভিডিও বার্তা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ফের এক নতুন উত্তাপ ছড়াতে পারে।

এরই মধ্যে শেখ হাসিনার দেশ প্রত্যাবর্তনের দাবিতে খোলামেলা সমর্থন জানিয়েছেন প্রখ্যাত ও বিতর্কিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনও। সম্প্রতি কলকাতায় একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, “যেভাবে আওয়ামী লিগের নেত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুল ও অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি। তাছাড়া, আওয়ামী লিগের মতো একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাও চরম অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। দলটিকে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই শেখ হাসিনা সসম্মान বাংলাদেশে ফিরে আসুন।”

সবমিলিয়ে, আগামী ৫ অগস্ট দিল্লির প্রেস কনফারেন্সকে কেন্দ্র করে যে আন্তর্জাতিক স্তরে বড় মাপের রাজনৈতিক তরজা শুরু হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। একদিকে আইনি সাজা ও মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া, আর অন্যদিকে দেশের মাটিতে ফিরে রাজনৈতিক পুনরুত্থানের লড়াই—শেখ হাসিনার পরবর্তী পদক্ষেপ এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা উপমহাদেশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *