‘মমতার পায়ের কাছে বসে থাকব’,-মন্তব্যের ‘খেসারত’ দিলেন জয়? বিক্ষোভে ফিরতে বাধ্য হলেন কবি

দীর্ঘ ১৯ বছর পর শনিবার রাতে কলকাতায় ফিরেছেন বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। খোদ লেখিকার কাছেই এটি তাঁর ‘দ্বিতীয় ঘরে ফেরা’র মতো। কিন্তু এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের আনন্দ ম্লান হয়ে গেল রবীন্দ্র সদনের এক অনভিপ্রেত ঘটনায়। তসলিমার বক্তব্য চলাকালীন কবি জয় গোস্বামীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনার পারদ চড়েছে তুঙ্গে। উপস্থিত দর্শকদের একাংশের তীব্র বিক্ষোভে সাময়িক স্তব্ধ হয়ে যায় অনুষ্ঠান।
ঠিক কী ঘটেছিল অনুষ্ঠানে? তসলিমা নিজের বক্তব্য রাখার সময় হঠাৎই কবি জয় গোস্বামীকে সসম্মানে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য দিকে মোড় নেয়।
মঞ্চে ওঠার আগেই তীব্র প্রতিবাদ দর্শকদের
মঞ্চ থেকে তসলিমার ডাক পেতেই সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী সামনের দিকে এগোতে শুরু করেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই দর্শকদের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ ও স্লোগান শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে প্রবল অস্বস্তির মুখে পড়ে জয় গোস্বামীকে শেষ পর্যন্ত নিজের আসনে ফিরে যেতে হয়।
সভাগৃহের ভেতরে তখন উচ্চস্বরে স্লোগান ও বিক্ষোভ চলতে থাকে। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার জেরে হতবাক তসলিমা কয়েক মুহূর্ত মাইক্রোফোনের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। আয়োজকরা বারবার দর্শকদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানালেও বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত নিজেই পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামেন তসলিমা। নীরবতা ভেঙে তিনি সরাসরি দর্শকদের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি কি কথা বলব? তাহলে অনুগ্রহ করে শান্ত হোন এবং নিজেদের আসনে বসুন।” তাঁর এই কড়া আবেদনের পরেই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং তিনি পুনরায় নিজের বক্তৃতা শুরু করেন।
দ্বিখণ্ডিত নেটিজেনরা, তুঙ্গে বিতর্ক
অনুষ্ঠানের এই মুহূর্তের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হয়েছে। নেটপাড়া এখন দুটি স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত।
-
একাংশের ক্ষোভ: অনেক নেটিজেনের দাবি, চলতি বছরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে কবি জয় গোস্বামী মন্তব্য করেছিলেন, “যত দিন বাঁচব, মমতা যেখানে থাকবেন আমি সেখানে থাকব। আমার জন্মাবধি এমন মুখ্যমন্ত্রী দেখিনি।…তাঁর পায়ের কাছে বসে থাকব।” কবির সেই রাজনৈতিক মন্তব্য ঘিরেই তখন ব্যাপক শোরগোল পড়েছিল। নেটিজেনদের একাংশের মতে, সেই ঘটনার প্রেক্ষিতেই ক্ষুব্ধ দর্শকেরা এদিন এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সুদীপ মুখার্জী নামের এক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, “ঠিকই হয়েছে।” অন্য একজন লিখেছেন, “অসাধারণ কবি জয় গোস্বামী কিন্তু তস্য অসাধারণ তাঁর পদস্খলন।”
-
অন্য পক্ষের সমর্থন: অন্যদিকে, আর এক পক্ষের বক্তব্য— এটি কোনও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ছিল না। তিনি একজন স্বনামধন্য কবি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন এবং খোদ তসলিমার আহ্বানেই মঞ্চে উঠছিলেন। এমন একজন প্রবীণ সাহিত্যিককে জনসমক্ষে হেনস্থা করা একেবারেই অনুচিত হয়েছে বলে মনে করছেন এই মতের মানুষরা।
উল্লেখ্য, অতীতে খোদ জয় গোস্বামীই তসলিমার দীর্ঘ নির্বাসন নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, ২০০৭ সালে যখন লেখিকাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, তখন তাঁর পাশে যথেষ্টভাবে দাঁড়াতে না পারায় তিনি নিজেকে ‘দোষী’ মনে করেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে সেই পুরনো সমীকরণ ছাপিয়ে এদিন দর্শকদের ক্ষোভই প্রধান হয়ে উঠল রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে।