৪০ লক্ষ ডলারের ইন্টারসেপ্টর ফেল! মার্কিন ঘাঁটিতে ত্রাস সৃষ্টি করা এই ইরানি অস্ত্রের আসল রহস্য কী?

দেখতে দেখতে পাঁচ মাস পার হয়ে গেলেও ইরান সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই; বরং আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ আরও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। এর জেরে মার্কিন সামরিক কর্তা-ব্যক্তিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরে শিয়া ফৌজের একটি বিশেষ হাতিয়ার মার্কিন সেনা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তেহরান আদর করে যার নাম দিয়েছে ‘খেইবার শেকান’ (Kheybar Shekan), যার আক্ষরিক অর্থ— ‘খাইবার দুর্গ ধ্বংসকারী’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদস্থ সেনাকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে নিশানা করতে নিজেদের রণকৌশলে বড় বদল এনেছে ইরান। আর এই কাজের জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছে ‘খেইবার শেকান’ নামের অত্যাধুনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্দিষ্ট একটি গতিপথ মেনে হামলা চালায় বলেই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সেগুলিকে মাঝআকাশে ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। কিন্তু খেইবার শেকান মাঝ-আকাশেই বিদ্যুৎ গতিতে নিজেদের রাস্তা বা গতিপথ বদল করতে সক্ষম। আর এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা বারবার এই ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ভয়ংকর এই অস্ত্রের বিশেষত্ব কী?

পেন্টাগন সূত্রে খবর, সাধারণত ড্রোনের ঝাঁকের সঙ্গে ওই ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করছে ইরানি ফৌজ। ২০২২ সালে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC)-র বহরে শামিল হওয়া এই কঠিন জ্বালানিচালিত (Solid Fuel) ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১,৪০০ থেকে ২,৪০০ কিলোমিটার। এর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৬,০০০ মাইল (৯,৬৫৭ কিমি) এবং এটি ৫৫০ কেজির বেশি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম।

কেন মার্কিন এয়ার ডিফেন্স ভেদ করতে সফল এই ব্রহ্মাস্ত্র?

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, খেইবার শেকানের সামনের অংশে একটি ছোট ইঞ্জিন যুক্ত করেছে ইরান। এর ফলে লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে নিমেষে নিজের গতিপথ বদলে ফেলতে পারে সেটি। শুধু তাই নয়, হামলার মুহূর্তে বিস্ফোরকবোঝাই অংশটি মূল ক্ষেপণাস্ত্রের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় মার্কিন এয়ার ডিফেন্স তাকে ট্র্যাক করতে ব্যর্থ হয়।

এর পাশাপাশি খরচের দিক থেকেও মার্কিন ফৌজকে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। প্যাট্রিয়ট বা থাড (THAAD) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক একটি ইন্টারসেপ্টর রকেটের দাম যেখানে ৪০ থেকে ৬০ লক্ষ ডলার, সেখানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রটি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সস্তা। ফলে তেহরানের সঙ্গে আমেরিকার কেবল সামরিক নয়, একপ্রকার আর্থিক যুদ্ধও চলছে। পেন্টাগনের অনুমান, নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে চিনের ‘বেইডু’ (BeiDou) উপগ্রহভিত্তিক দিক নির্দেশকারী ব্যবস্থার সাহায্য নিচ্ছে ইরান।

চিন ও পাকিস্তানের যোগ এবং কূটনৈতিক সমীকরণ

মার্কিন সেনাকর্তাদের একাংশের দাবি, এই সংঘাতে বেজিং ও ইসলামাবাদের ভূমিকাও যথেষ্ট সন্দেহজনক। চিনের কাছ থেকে অস্ত্র সাহায্য পাচ্ছে তেহরান, যা পাক অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) হয়ে পাকিস্তানের মাধ্যমে আইআরজিসির কাছে পৌঁছোচ্ছে। এর পিছনে পাকিস্তানের সেনাসর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মদত রয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও চলতি বছরের মে মাসে চিন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের কাছ থেকে ইরান সংঘাতে নাক না গলানোর আশ্বাস পেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তবে বর্তমান বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

সব মিলিয়ে, ইরানের খেইবার শেকানের বিধ্বংসী ক্ষমতা এবং চিনা-পাক যোগসাজশের জেরে পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি ও সেনা মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় যথেষ্ট অস্বস্তিতে রয়েছে হোয়াইট হাউস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *