৭৫ শতাংশ পড়াশোনা শেষের পর মে মাসে ভর্তি! বিএড কলেজের কাণ্ড দেখে চোখ কপালে আদালতের, এল বড় নির্দেশ

রাজ্যে বেসরকারি বিএড কলেজগুলি শিক্ষাবর্ষজুড়ে অনিয়মিতভাবে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করছে এবং এর জেরে বিপাকে পড়ছেন বহু শিক্ষার্থী। বিএড কোর্স করানোর নামে এই রমরমা ব্যবসা নিয়ে চরম ক্ষোভপ্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। কলেজগুলি ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠনের মান নিয়ে আদৌ কতটা চিন্তিত, সেই বিষয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
শনিবার এই সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতরকে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা।
আদালতের কড়া নির্দেশ ও বিকল্প ব্যবস্থার ভাবনা
নির্দেশে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, উপযুক্ত আধিকারিকদের নিয়ে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করবে উচ্চশিক্ষা দফতর। এই দল রাজ্যের বেসরকারি বিএড কলেজগুলির কর্মকাণ্ড পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দেখবে। পাশাপাশি, ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন’ (এনসিটিই) কর্তৃপক্ষকেও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে এই তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
পাশাপাশি, ইতিমধ্যে যে ছাত্রছাত্রীরা প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষায় বসতে পারছেন না, তাঁদের ভবিষ্যৎ যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা।
ঠিক কী অভিযোগ উঠেছে?
বিভিন্ন জেলায় বেসরকারি বিএড কলেজগুলিতে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে যাওয়ার প্রায় বছরখানেক পরও দেদার ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। এদিকে নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ১০০ দিনের ক্লাস হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেরিতে ভর্তি হওয়ার কারণে সেই নতুন পড়ুয়ারা প্রয়োজনীয় ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছেন না, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের পরীক্ষায় বসতে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে পড়ুয়াদের।
আদালতে মামলার শুনানিতে বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“কীসের জন্য টাকা দিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা? টাকা দিয়ে কোর্স করবে, তারপর চাকরি পাবে না, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে? এই তো অবস্থা? সেমেস্টার শুরু হয়েছে গত বছর জুলাই মাসে, আর ছাত্রছাত্রী ভর্তি চলছে এবছরের মে মাসেও? শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে! তারপর অগস্ট মাসের প্রথম সেমেস্টারে পরীক্ষায় বসার অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে! বিশ্ববিদ্যালয় ও এনসিটিই-র কোনও রকম নজরদারির ব্যবস্থা নেই!”
মামলার প্রেক্ষাপট ও কলেজের চাঞ্চল্যকর যুক্তি
কবিগুরু নোবেল সেন্টেনারি কলেজের (বাবা সাহেব আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ) ২০২৫-২৭ শিক্ষাবর্ষের বিএড কোর্সের দু’জন পরীক্ষার্থী কলকাতা হাইকোর্টে এই মামলা করেছিলেন। কলেজে কিছু আসন ফাঁকা থাকায় চলতি বছরের মে মাসে ফের ভর্তি নেওয়া হয়। গত ২৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমেস্টারের পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি করলে মামলাকারীরা ফর্ম ফিলাপ করেন। কিন্তু ১০০ দিনের ক্লাস না হওয়ায় তাঁদের পরীক্ষায় বসতে বাধা দেওয়া হয়।
মামলার শুনানিতে কবিগুরু নোবেল সেন্টেনারি কলেজের আইনজীবীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, “ভর্তি না নিলে শিক্ষকদের স্যালারি দিতে পারবে না কলেজ!” এই যুক্তি শোনার পরই বিচারপতি অমৃতা সিনহা আরও কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন, “এর থেকেই বোঝা যায় কলেজ মোটেও এই ছাত্রদের পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখে না। পড়ার মান কতটা ভালো, সে নিয়েও সন্দেহ আছে।” নিয়মিত নজরদারির অভাবে বেসরকারি কলেজগুলোর এই রমরমা কারবার আগামী দিনে কীভাবে রোধ করা যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।