নেপাল কেন জ্বলছে? ‘ধর্মযুদ্ধে’ রক্তারক্তি, শহরে কার্ফু ও সেনা মোতায়েন, উত্তপ্ত পরিস্থিতি

নেপালের সুনসারি জেলায় শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক হিংসা এখন দেশের একাধিক এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফু জারি করেছে প্রশাসন এবং নামানো হয়েছে নেপাল সেনাকেও। গত চার দিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, পাশাপাশি আহত হয়েছেন বহু মানুষ।
কীভাবে শুরু হল এই হিংসা?
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সুনসারি জেলার দেবাঙ্গঞ্জ এলাকায় একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রার সময় লাউডস্পিকারের ব্যবহার এবং ধর্মীয় পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমুল বচসা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। পুলিশ ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে নামলে সংঘাত চরমে পৌঁছায় এবং পুলিশকে গুলি চালাতে হয়।
এর জেরে দ্রুত মাধেশ প্রদেশের ধনুষা, সিরাহা সহ একাধিক জেলায় বিক্ষোভ ও হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে বহু দোকানপাট, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কোন কোন এলাকায় কার্ফু জারি?
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন একাধিক স্পর্শকাতর অঞ্চলে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
সুনসারি ও মাধেশ প্রদেশ: ইনারুয়া, জনকপুর, সিরাহা, গোলবাজার এবং লাহান।
-
ধনুষা জেলা: লক্ষ্মিনিয়া হাটবাজার, বেলাউনি রোড, নগরাইন পৌরসভা, দুধমতি সেতু ও জনকপুরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ।
এই সমস্ত সংবেদনশীল এলাকায় বিপুল সংখ্যক নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (APF) এবং নেপাল সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আকাশপথে হেলিকপ্টার দিয়েও নজরদারি চালানো হচ্ছে। হিংসার জেরে বহু জেলায় জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত; বাজারঘাট ও স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে এবং যাতায়াতও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও ‘শহিদ’ ঘোষণা
এই সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ২৪ বছরের ওম প্রকাশ মেহতা এবং ২২ বছরের জয় প্রকাশ মেহতা। দেবাঙ্গঞ্জ গ্রামীণ পৌরসভা এই দুজনকে স্থানীয় স্তরে ‘শহিদ’ ঘোষণা করেছে এবং নেপাল সরকারের কাছে তাঁদের সরকারি শহিদের মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এছাড়াও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লক্ষ নেপালি টাকা আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি গুলিতে স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা গুরুতর আহতদের ২ লক্ষ এবং সামান্য আহতদের ৫০ হাজার নেপালি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শান্তির বার্তা
দেশের এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে দেশবাসীর উদ্দেশে শান্তির বার্তা দিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আবেদন জানিয়ে তিনি দেশকে দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন। যদিও এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধী দলগুলি।