হাতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্যান্ত কেউটে, ছোবল তো দূরঅস্ত! কালনার এই গ্রামে সাপের কামড়ই নাকি ‘প্রসাদ’!

‘ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না…’ সুকুমার রায়ের বিখ্যাত বাপুরাম সাপুড়ে কবিতার এই পংক্তিগুলো বাস্তবে মিলে যায় পশ্চিমবঙ্গের কালনার এক প্রান্তে। জ্যান্ত কেউটে সাপ কাউকে ছোবল মারছে না, উল্টে খালি হাতে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এমন অলৌকিক দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় কালনার মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রামে। এখানে মহা সমারোহে অনুষ্ঠিত হয় জ্যান্ত কেউটে সাপের পুজো। তবে গ্রামবাসীদের কাছে এই বিষধর সাপেরা কোনো ভয়ের বস্তু নয়, তাঁরা সাক্ষাৎ ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’। প্রতি বছর এই পুজোকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ গ্রামে ভিড় জমান।
দেবীর রূপেই কেউটে সাপের আরাধনা
গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি, পলসোনা গ্রামের অলিগলিতে এবং বিভিন্ন জায়গায় অবাধে ঘুরে বেড়ায় বিষধর কেউটে সাপ। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাঁরা এই সাপদের চোখের সামনে দেখে বড় হয়েছেন এবং কখনোই এই সাপেরা গ্রামের কোনো মানুষের ক্ষতি করেনি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখিত বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনির সেই দেবীই এখানে ‘ঝঙ্কেশ্বরী’ রূপে বিরাজ করছেন।
আশ্চর্যের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান
পুজো উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দিনটিতে পলসোনা গ্রামসহ আশেপাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। পুজোর দিন সন্ধ্যায় গ্রাম পরিক্রমার পর মন্দিরের সামনে একটি মাটির কলস ভাঙা হয়। গ্রামবাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস, ওই ভাঙা কলসের টুকরো বাড়ি এনে রাখলে বাড়িতে কোনো বিষধর সাপ প্রবেশ করে না। এমনকি এই সাপগুলির দংশনকে তাঁরা সাধারণ কোনো ‘কামড়’ হিসেবে দেখেন না, বরং তা তাঁদের কাছে পরম সৌভাগ্যের ‘প্রসাদ’।
সাত গ্রামে এই বিশেষ পুজোর প্রচলন
শুধু একা পলসোনা গ্রামেই নয়, মঙ্গলকোটের ছোটপোষলা, মুসারু, নিগন এবং ভাতারের বড় পোষলা, শিকোত্তর ও মুকুন্দপুর—এই মোট সাতটি গ্রামেই ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর সুপ্রাচীন প্রচলন রয়েছে। এদিন এই পুজো উপলক্ষে মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষও সশরীরে ঝঙ্কেশ্বরী মন্দিরে উপস্থিত হয়ে পুজো দেন।
সর্পবিশারদের ব্যাখ্যা
স্থানীয় মানুষের এই অন্ধবিশ্বাস ও অলৌকিক দাবির বিপরীতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন সর্পবিশারদ ধীমান ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, এই গ্রামে যে সাপগুলি ঘুরে বেড়ায়, তার অধিকাংশই অত্যন্ত বিষধর কেউটে প্রজাতির। এই সাপের দংশনে মারাত্মক বিষক্রিয়া হতে পারে। তবে দীর্ঘকাল ধরে মানুষ ও সাপের এই শান্তিপূণ সহাবস্থান এবং গ্রামবাসীরা সাপগুলিকে বিরক্ত না করায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা দংশনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম ঘটে।