বিশেষ: বাজারে নেই চাহিদা, কমছে উপার্জন, হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার কাঁসা শিল্পের সোনালি দিন

কাঁসার থালার কিনারায় পদ্মপাতার নকশা, মাঝখানে গোল করে সাজানো ভাত আর তার চারপাশের বাটিতে হরেক পদের সুস্বাদু আয়োজন—বাঙালি সংস্কৃতিতে কাঁসা মানেই এক নস্ট্যালজিয়া, আভিজাত্য আর আবেগের ছোঁয়া। জন্মদিন হোক বা জামাইষষ্ঠী, মা-ঠাকুমায়েদের আলমারি থেকে পুরোনো কাঁসার থালা বের হওয়ার এই দৃশ্য বাঙালির চিরচেনা। কথিত আছে কাঁসায় খেলে বুদ্ধি বাড়ে (‘কানসিয়ম বুদ্ধিবর্ধকম’), যদিও এর নেপথ্যে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকুক, বাঙালির নাড়ির সঙ্গে কাঁসার যোগ অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার সেই বিখ্যাত কাঁসা শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকছে। জিআই (GI) স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও কেন শিল্পীদের ঘরে ফিরছে না সুদিন? চলুন খতিয়ে দেখা যাক।

লোকমুখে ‘শিল্প গ্রাম’ কেঞ্জাকুড়া এবং কাঁসা তৈরির ঐতিহ্য

বাঁকুড়ার এক নম্বর ব্লকের দ্বারকেশ্বর নদের তীরে অবস্থিত কেঞ্জাকুড়া গ্রাম লোকমুখে ‘শিল্প গ্রাম’ নামে পরিচিত। তবে শুধু কেঞ্জাকুড়া নয়, শুশুনিয়া, মলিয়ান, হেলনা পুখুরিয়া, বিষ্ণুপুর অঞ্চলেও কাঁসা তৈরির প্রচলন রয়েছে। লাল মাটির পথ ধরে এগোলেই কানে আসে হাতুড়ি আর হাপরের ‘ঠং ঠং’ শব্দ। ৭:২ অনুপাতে তামা ও টিনের মিশ্রণে তৈরি হয় এই কাঁসা। অতীতে চার-পাঁচজন মিলে বড় হাতুড়ির ঘা দিয়ে এই বাসন তৈরি করতেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাপরের শব্দে মুখরিত থাকত চারপাশ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ছবিটা আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একসময়ে যেখানে কেঞ্জাকুড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৯০টি ইউনিট বা কামারশাল ছিল, বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে তা কমে মাত্র ৩০টিতে এসে ঠেকেছে!

কাঁসা শিল্পের বেহাল দশার মূল কারণগুলি কী কী?

  • কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম: কাঁচামালের দাম মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় পাকা কাঁসার বাসনের দাম প্রায় ২৫০০ টাকা প্রতি কেজিতে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

  • সস্তার বিকল্পের আগ্রাসন: স্টিল, কাচ ও অ্যালুমিনিয়ামের সস্তা পণ্যের রমরমা বাজারে কাঁসার চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। অনুষ্ঠানবাড়িতেও এখন আর উপহার হিসেবে কাঁসা দেওয়ার রেওয়াজ প্রায় উঠে গেছে।

  • কাজে অনীহা ও পরিযায়ী শ্রমিক: মহাজনরা পাকা মাল নিতে না চাওয়ায় শিল্পীরা সপ্তাহে মাত্র একদিন কাজ করার সুযোগ পান। ফলস্বরূপ, পেটের টানে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শিল্পীদের আক্ষেপ ও প্রশাসনের বক্তব্য

প্রবীণ শিল্পী সুজয় চন্দ ও সংগঠনের সম্পাদক লালচাঁদ চন্দ আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, জিআই (GI) স্বীকৃতি পেলেও বাজারে বিক্রি না থাকায় কারিগরদের সংসার চলছে না। নতুন প্রজন্মের শিল্পী নিতাই চন্দ ও তীর্থ কাইতিরাও একই সুর চড়িয়ে জানান, সরকার যদি সঠিক বিপণন, প্রশিক্ষণ এবং কাঁচামালের জোগানের ব্যবস্থা না করে, তবে এই শতাব্দীপ্রাচীন শিল্প চিরতরে হারিয়ে যাবে।

অন্যদিকে, বাঁকুড়ার বিধায়ক নীলাদ্রিশেখর দানা আশাবাদী সুরে জানিয়েছেন যে, সরকার এই শিল্প ও শিল্পীদের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সবরকম সহায়তা প্রদান করা হবে।

আধুনিকতার ভিড়ে কাচ বা চিনামাটির থালা যতই আভিজাত্য দেখাক না কেন, বাঙালির আবেগ আর ঐতিহ্যের প্রতীক এই কাঁসার বাসন কি তবে কেবলই স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে? নাকি সঠিক সরকারি সাহায্যে ফের আলো ফুটবে কেঞ্জাকুড়ার হাপরে? সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খোঁঝেন বাংলার ঐতিহ্যপ্রেমীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *